আবারো আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান পেট্রোবাংলার


বিশেষ প্রতিনিধি , আপডেট করা হয়েছে : 20-05-2026

আবারো আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান পেট্রোবাংলার

আবারও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। এবার দেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ২৬টি ব্লকে আগামী সপ্তাহে ওই দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)।

এবারের দরপত্রে বিদেশী কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’-এ বেশকিছু সংশোধন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে এ মডেলের খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ২৩ মাস পর আবারো সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের তৎপরতা শুরু হতে যাচ্ছে।

ফ্লাশ ব্যাক 

২০১৬ সালে আহ্বান করা আন্তর্জাতিক এক দরপত্রের ভিত্তিতে বঙ্গোপসাগরের গভীরে ১২ নম্বর ব্লকে গ্যাস উত্তোলনের কাজ পেয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার তেল-গ্যাস উত্তোলনকারী কোম্পানি পস্কো দাইয়ু। যদিও পেট্রোবাংলার সঙ্গে দাম নিয়ে মতবিরোধের কারণে একপর্যায়ে ব্লকটি থেকে গ্যাস না তুলেই চলে যায় কোম্পানিটি। পস্কো দাইয়ু এখন ওই ব্লকের পাশেই মিয়ানমার অংশে সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। জানা যায়, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ঘেঁষে অবস্থিত মিয়া ও শোয়ে কূপ থেকে কোম্পানিটি এরই মধ্যে কয়েক ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তুলেছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এ গ্যাস পাইপলাইনে করে চীনে রফতানিও হয়েছে।

এদিকে এরপর দীর্ঘদিন সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আর কোনো দরপত্র আহ্বান করেনি পেট্রোবাংলা। প্রায় আট বছর বিরতির পর গত ২০২৪ সনের ১০ মার্চ বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। শুরুতে এ দরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল গত ১০ সেপ্টেম্বর। পরে তা আরো তিন মাস বাড়িয়ে ওই বছরের ৯ ডিসেম্বর বেলা ১টা পর্যন্ত এ দরপত্র জমা দেয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। সময়সীমা বাড়ানোর পরও পেট্রোবাংলার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দরপত্র জমা দেয়নি কোনো তেল-গ্যাস কোম্পানি। 

ওই সময় পেট্রোবাংলার আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্রের নথি কিনেছিল বিদেশী সাতটি কোম্পানি। আর আগে করা বহুমাত্রিক জরিপের তথ্য-উপাত্ত কিনেছিল আরো দুটি কোম্পানি। যদিও তাদের কেউই শেষ পর্যন্ত দরপত্র জমা দেয়নি। 

বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিল মার্কিন কোম্পানি এক্সনমবিল ও শেভরন, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস, নরওয়ে ও ফ্রান্সের যৌথ বিনিয়োগী কোম্পানি টিজিএস অ্যান্ড স্লামবার্জার, জাপানের ইনপেক্স করপোরেশন ও জোগোম্যাক, চীনের সিনুক, সিঙ্গাপুরের ক্রিস এনার্জি এবং ভারতের ওএনজিসি। এর মধ্যে সমুদ্রে বহুমাত্রিক জরিপের তথ্য কিনেছিল শেভরন, এক্সনমবিল, ইনপেক্স, সিনুক ও জোগোম্যাক। শেষ পর্যন্তু তাদের কেউই দরপত্র জমা দেয়নি।

এর নেপথ্যে কী হতে পারে সে বিষয়ে সংশ্লিস্টরা মনে করেন, ওই সময় দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী না হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যহ্রাসও এক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা রাখতে পারে। 

এবার আশাবাদ 

জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে। আগামী সপ্তাহে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। দেশী ও বিদেশী পত্রিকায় এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে পেট্রোবাংলা। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দেশে ‘রোড শো’ করবে জ্বালানি বিভাগ তথা পেট্রোবাংলা।

এ ব্যাপারে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম স্থানীয় একটি মিডিয়ায় বলেন, ‘সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগামী ২৪ মে রোববার আন্তর্জাতিক দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। এরই মধ্যে জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। এবারের দরপত্র আগের চেয়ে আরো বেশি আকর্ষণীয় করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসের ট্যারিফ, পাইপলাইন নির্মাণ ব্যয়, তথ্য-উপাত্তের দাম কমানো, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে অংশগ্রহণ বিষয়ে সংশোধন আনা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক দরপত্রে বিদেশী কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আকৃষ্ট করা। এবার দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি রোড শো, বিদেশী দূতাবাসগুলোকে চিঠি দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করি পিএসসিতে যেসব সংশোধন আনা হয়েছে, তাতে বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ভালো ফলাফল মিলবে।’

বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ পরিকল্পনায় জ্বালানি খাতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেয়া হয়। যার মধ্যে ছিল স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি, বেশকিছু কূপের সংস্কার এবং অফশোর ও অনশোর মডেল পিএসসি চূড়ান্তকরণ। এরই মধ্যে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে অফশোর মডেল পিএসসি চূড়ান্ত করে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে যাচ্ছে।

জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্রমোশনাল প্যাকেজ বিক্রি শুরু হবে। এ দরপত্র জমা দেয়ার সময়সীমা থাকবে আগামী চলতি বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে বিদেশী কোম্পানিগুলো পেট্রোবাংলার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জরিপের তথ্য-উপাত্ত ক্রয় করতে পারবে। সেই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দরপত্র জমা দেয়ার সুযোগ থাকবে।

গত ৭ মে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’ নীতিমালার খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। ক্রমবর্ধমান এলএনজি আমদানি ব্যয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্ব দিয়ে সরকার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে এ নতুন কাঠামো গ্রহণ করে বলে জানান পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশোধিত পিএসসির আওতায় যেসব সংশোধন আনা হয়েছে, সেগুলো ইতিবাচক। এসব সংশোধনের মধ্য দিয়ে দেশের সমুদ্রসীমায় বিদেশী কোম্পানিকে কাজ দেয়া গেলে তাতে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যেতে পারে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)