যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেটে তিন মুসলিম নারী অভিযোগ করেছেন, গ্রেফতারের পর জেলে নেওয়ার সময় তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক হিজাব খুলতে বাধ্য করা হয়েছে। এ ঘটনায় তারা স্থানীয় শেরিফ দফতরের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি গত ২২ এপ্রিল কলম্বাসের একটি যুক্তরাষ্ট্র ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে দায়ের করা হয়। এতে বলা হয়, ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টি শেরিফের দফতরের কর্মকর্তারা গ্রেফতারের পর বুকিং প্রক্রিয়ার সময় ওই তিন নারীকে তাদের ধর্মীয় মাথার আবরণ খুলতে বাধ্য করেন। মামলার বাদীদের মধ্যে দুজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে সুমাইয়া হামাদমাদ এবং হোদা এলাহিনিয়া। তৃতীয় নারীকে জেন ডো নামে পরিচয় গোপন রেখে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, শেরিফ ডালাস বাল্ডউইন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী ধর্ম পালনের অধিকার লঙ্ঘন করেছেন। পাশাপাশি, তারা রিলিজিয়াস ল্যান্ড ইউজ অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনালাইজড পারসনস অ্যাক্ট (আরএলইউআইপিএ) আইনও ভঙ্গ করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে এক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় এ তিন নারীসহ মোট ৩৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি অভিযানের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে ইসরায়েলের সঙ্গে আর্থিক বিনিয়োগ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।পরবর্তীতে গ্রেফতার হওয়া অধিকাংশের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার বা হ্রাস করা হয়।
মামলায় বলা হয়, গ্রেফতারের পর ওই নারীদের জ্যাকসন পাইক কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে নেওয়া হয়। সেখানে বুকিংয়ের সময় কর্মকর্তারা তাদের হিজাব খুলতে বাধ্য করেন, যাতে তাদের ছবি তোলা যায়। মামলার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের বাইরে অন্য পুরুষদের সামনে হিজাব ছাড়া উপস্থিত হওয়া ওই নারীদের গভীরভাবে ধারণ করা ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী। এতে তাদের ধর্মীয় মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।সুমাইয়া হামাদমাদ প্রায় ৪০ বছর ধরে হিজাব পরিধান করে আসছেন। তার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ছবিতেও তিনি হিজাব পরা অবস্থায় আছেন। মামলায় বলা হয়, গ্রেফতারের সময় বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ তার ছবি হিজাবসহ তুলেছিল। কিন্তু পরে জেল কর্তৃপক্ষ তাকে বারবার হিজাব খুলতে বাধ্য করে এবং আপত্তি জানানোর পরও তা উপেক্ষা করা হয়।
অভিযোগে আরো বলা হয়, কয়েকজন কর্মকর্তা তাকে জোরপূর্বক হিজাব খুলে দেওয়ার হুমকি দেন। আটক অবস্থায় প্রায় ১০ ঘণ্টা তাকে হিজাব ও নামাজের জায়নামাজ ছাড়া রাখা হয় এবং এ সময় তাকে পুরুষ কর্মকর্তা ও অন্যান্য বন্দিদের সামনে উন্মুক্ত অবস্থায় থাকতে হয়।
হোদা এলাহিনিয়াও একই ধরনের অভিজ্ঞতার শিকার হন। গ্রেফতারের সময় তার হিজাব খুলে ফেলা হলেও তিনি অন্য একটি কাপড় দিয়ে আংশিকভাবে মাথা ঢাকতে সক্ষম হন। কিন্তু জেলে নেওয়ার পর ছবি তোলার সময় সেটিও খুলতে বাধ্য করা হয় এবং প্রায় এক ঘণ্টা তাকে কোনো আবরণ ছাড়া থাকতে হয়। তৃতীয় নারী ‘জেন ডো’ও কর্মকর্তাদের নির্দেশে বাধ্য হয়ে হিজাব খুলে ফেলেন, যদিও তিনি তার ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তার অভিযোগ, তার কথা উপেক্ষা করা হয় এবং পরে তাকে আংশিকভাবে হিজাব ফেরত দেওয়া হয়।
মামলায় আরো উল্লেখ করা হয়, ওই নারীদের হিজাববিহীন মাগশটবা গ্রেফতারের ছবি অনলাইনে প্রকাশিত হয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ডাটাবেজে সংরক্ষিত রয়েছে। এমনকি জনসাধারণের তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে এসব ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব, যা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের লঙ্ঘনকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। এ অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে অপমানজনক ও মর্যাদাহানিকর বলে বর্ণনা করেছেন বাদীরা।
বাদীরা আদালতের কাছে দাবি জানিয়েছেন, তাদের হিজাব ছাড়া তোলা সব ছবি মুছে ফেলতে ও ধ্বংস করতে হবে। পাশাপাশি শেরিফ দফতরকে এমন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের নির্দেশ দিতে হবে, যাতে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা পায় এবং কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়া তারা আর্থিক ক্ষতিপূরণও দাবি করেছেন।
এই মামলায় সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিক অধিকার সংস্থা কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেইয়ার)। সংস্থাটির আইনজীবী ক্যাথরিন কেক বলেন, ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টির এই নীতি নিঃসন্দেহে অসাংবিধানিক। আটক ব্যক্তিরা তাদের ধর্মীয় অধিকার হারান না, এবং কর্তৃপক্ষ তা জানত।
মামলায় আরো অভিযোগ করা হয়, কিছু কর্মকর্তা নারীদের নিয়ে উপহাস করেছেন, হেয় করেছেন এবং জোরপূর্বক হিজাব খুলতে বাধ্য করেছেন। একজন কর্মকর্তা হামাদমাদকে বলেন, তিনি ভালো ব্যবহারের যোগ্য নন। আরেকজন কর্মকর্তা এলাহিনিয়াকে ভুলভাবে জানান যে গ্রেফতারের পর তিনি তার সাংবিধানিক অধিকার হারিয়েছেন।এই ঘটনায় বাদীরা আশা করছেন, তাদের মামলা ভবিষ্যতে এমন নীতির পরিবর্তন আনবে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
হোদা এলাহিনিয়া বলেন, আমরা যে অপমানজনক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি, এ মামলা সে ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং আমাদের অধিকার পুনরুদ্ধারের একটি পদক্ষেপ। শেরিফ দফতর চলমান মামলার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং ধর্মীয় পোশাক সংক্রান্ত তাদের নীতিমালা নিয়েও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
এ মামলা যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আচরণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে দেশটির বিভিন্ন আদালত একই ধরনের নীতিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। এ ঘটনা শুধু তিন নারীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং এটি বৃহত্তর মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।