বাংলাদেশের রাজনীতি কি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে?


বিশেষ প্রতিনিধি , আপডেট করা হয়েছে : 29-04-2026

বাংলাদেশের রাজনীতি কি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর জোট সম্পর্ক ছিল দীর্ঘ ও গভীর। দুটি দল মিলে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে সরকার গঠন করেছিল, এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে একই সারিতে লড়াই করেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পট পাল্টে যায়। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সাথে তার দীর্ঘ দশকের জোট সম্পর্ক ভেঙে দেয় এবং নির্বাচনের আগে নিজেকে একটি উদার, গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। 

এই বিচ্ছেদ কি শুধুই কৌশলগত রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, নাকি এটি দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার ইঙ্গিত বহন করছে? এমন প্রশ্ন এখন সর্বত্র। দীর্ঘ লড়াইয়ে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীদের। কিন্তু মাত্র দুইমাস না যেতেই সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা জামায়াত এনসিপি জোট যখন রাজপথে লড়াইয়ের হুমকি দেয়, বিক্ষোভ মিছিল করে, সভা সমাবেশ করছে, সরকারকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয় তখন জনগণের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয় সংসদের প্রতি। ইতিমধ্যে এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বলেছেন বিভিন্ন অজুহাতে একটি দল দেশে বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে চায়। সরকার প্রধানের মুখ থেকে এমন বাক্য মোটেও স্বস্তির বিষয়ও না। তাহলে কেন জামায়াত জোটের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী অমন কথা বলতে বাধ্য হলেন? 

দুই মাসের সরকারে এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যাতে সরকারের উপর বিরোধী জোট চরম অসন্তুষ্ট হয়ে রাজপথে নেমে পড়ার হুমকি দিতে পারে, আন্দোলনের ডাক দিতে পারে। এ দুইমাসে ম্যানেজম্যান্টে কিছুটা সমস্যা হয়েছে হয়তো, কিন্তু এরবাইরে বড় সমস্যা তো বৈশ্বিক। ইরান, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে ভয়াবহ যুদ্ধ, এবং তার প্রভাব বাংলাদেশই নয়, গোটা বিশ্বের প্রতিটা দেশেই অ্যাফেক্ট পড়েছে। বাংলাদেশ থেকে শত শত ফ্লাইট স্থগিত হয়েছে, নিয়মিত যে জ¦ালানি আমদানি হতো সেটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এটা সবারই জানা। কিন্তু এসব ইস্যুতে মানুষ যখন ওভারকামে ব্যস্ত, তখন জুলাই সনদ ইস্যু নিয়ে রাজপথে আন্দোলনের ডাকের রহস্য নিয়ে এখন দেশের নানা স্থরে আলোচনা। 

বিএনপি সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বার বার বলছেন জুলাই সনদের প্রতিটা বিষয় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হবে। তার সরকার এটা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এরপরও ওই ইস্যুতে দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার বিষয়টা নিয়ে এখন কিছুটা উদ্বিগ্ন সরকারও। 

সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক। সংসদীয় রীতিতে যা হবার তাই হচ্ছে। সূচনা থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের দেয়া ১৩৩ অধ্যাদেশগুলো বাস্তবায়নে চেষ্টা করছে সরকার। কিছু কিছু বিল বাকি থাকলেও সেখানে পরবর্তিতে আলোচনা করে আবার সংসদে উত্থাপনেরও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কেননা অন্তর্বতী সরকার রীতি ভঙ্গ করে অধ্যাদেশ জারি করে রেখে গেছেন। কিছু কিছু বিলে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট দেয়া ছিল, সেসব নোট অব ডিসেন্টসহ অধ্যাদেশ জারির কথা। কিন্তু ওইসব নোট অব ডিসেন্ট হাওয়া করে দিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। যেহেতু বিএনপি দেশের মেজর একটি দল, তারাই এখন দুইশতাধিক আসন নিয়ে সরকার পরিচালনায়, যা নির্বাচনের আগেও ধারণা করা হয়েছিল। সে দলের আপত্তি, নোট অব ডিসেন্ট ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হলো আর অন্যান্য ছোট দলের শতভাগ মত নেয়া অধ্যাদেশ সংসদে একের পর এক পাস করে দেবে এটা ভাবা কী বোকামী নয়। বিএনপিকে এতটা অবজ্ঞা করা হবে, আর সেটা তারা মানবে? এরপরও বিএনপি তাদের নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলো আলোচনা করে বিল পাসের প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরও অসহ্য হয়ে আন্দোলনে নেমে রাজপথ উত্তপ্ত করার রহস্য অবশ্যই রয়েছে। এ জন্যই তারেক রহমান এটাকে বিশৃংখলা তৈরির চেষ্টা ও দীর্ঘ হরতাল করার সম্ভব্য চেষ্টা প্রতিহত করার কথা বলছেন ও মানুষকে সতর্ক করছেন। 

নেপথ্যে কী 

৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনদের পরামর্শে জাতীয় ঐক্যমত কমিশন ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণয়ন করে, যার লক্ষ্য হলো গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর রাষ্ট্রের আমূল সংস্কার। নতুন সরকার এই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলায় বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিমত। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসজুড়ে এই আন্দোলনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জুলাই সনদ নিয়ে লাগাতার আন্দোলনের ডাক। এটা বাস্তবায়নে প্রয়োজনে একটা দীর্ঘ মেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকেও যাচ্ছে জামায়াত জোট। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে সংসদ ও সচিবালয় ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দেয়া হচ্ছে। 

বিচ্ছেদের মূল কারণ

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন যে দুই দীর্ঘদিনের মিত্রের মধ্যে বিরোধ মূলত নির্বাচনের সময়সীমা ও সংস্কার বাস্তবায়নের প্রশ্নে ফেটে পড়েছিল। জামায়াত চেয়েছিল নির্বাচন বিলম্বিত হোক, যাতে আওয়ামী বিরোধী অনুভূতিকে ইসলামপন্থী আন্দোলনের দিকে পরিচালিত করা যায়। অন্যদিকে বিএনপি চেয়েছিল দ্রুত নির্বাচন। সে থেকেই দুইয়ে পার্থক্য। অন্তর্বর্তী সরকারে প্রভাব ছিল জামায়াতের এমনটাই মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। এ জন্যই নির্বাচন বিলম্ব চেয়েছিল জামায়াত-এনসিপি। এনসিপির নেতা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হোক। কিন্তু বিএনপির কঠোরতা ও বিভিন্ন চাপে অন্তর্বর্তী সরকার ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। 

ওই নির্বাচনে জামায়াত আর বিএনপির মিত্র নয়, বরং আসন্ন নির্বাচনে এটি বিএনপির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, যেখানে প্রধান লড়াই ছিল বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপি জোটের মধ্যে। ৫৯.৮৮% ভোটার উপস্থিতিতে বিএনপি ২০৯টি আসন জিতে ল্যান্ডস্লাইড বিজয় অর্জন করে, আর জামায়াত ৬৮টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। 

নির্বাচন-পরবর্তী বিরোধিতা

বিএনপি সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয়, তবে জামায়াত-এনসিপি জোট জুলাই জাতীয় সনদ সংস্কার বাস্তবায়নের ক্রমধারা নিয়ে মতবিরোধে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বয়কট করে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি ও জামায়াত, যারা একসময় হাসিনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছিল, এখন হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিসরে আধিপত্যের জন্য লড়াই করছে, যা সহিংস সংঘর্ষে পরিণত হতে পারে। আর সেটা রাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহ সবত্রই। অথচ কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দলের অন্যতম বৃহৎ শক্তি আওয়ামী লীগ আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠার লড়াইয়ে রয়েছে। নানাভাবে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশে তারা আবারও পুরানো ভূমিকায় ফিরে আসুক। এতে তারা যে ধরনের পলিটিক্স প্রয়োজন সেটাই তারা করবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে বিএনপি জামায়াত পরস্পর বিরোধী অবস্থানে থাকা মানেই একটা স্পেস লাভ করবে পরাস্ত ওই দলটি। তবে এখানেও রাজনীতি রয়েছে। কারণ ওই শক্তি ভবিষ্যতে কার ছত্রছায়ায় যাবে তেমন এক মনস্তাত্তিক লড়াই হবে না তার গ্যারান্টি কী। তবে এটাও ঠিক এ মুহূর্তে বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের দূরত্ব বৃদ্ধি একটি জটিল দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করেছে।

হ্যাঁ, রাজনীতি উত্তপ্ত হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে, কারণ দুটি দলের বিশাল সাংগঠনিক শক্তি এখন একে অপরের মুখোমুখি। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, বিএনপির অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং জামায়াত-এনসিপির “শ্যাডো ক্যাবিনেট” ঘোষণা- সবই উত্তাপের ইঙ্গিত দেয়। তবে এটিই একমাত্র পরিণতি নয় একটি প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রে বিরোধীপক্ষের শক্তিশালী উপস্থিতি সুশাসনের জন্য অপরিহার্য। জামায়াতের ৬৮ আসন পাওয়া এবং সংসদে সক্রিয় বিরোধী দলের ভূমিকা পালন দেশকে এককদলীয় শাসনের ফাঁদ থেকে রক্ষা করবে এটাও সত্য।

তবুও যে কথা না বললেই নয়, সেটা হলো দেশের প্রধান দুই পক্ষের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কি সংসদীয় বিতর্কের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি প্রথমে রাজপথের আন্দোলনের ডাকে সূচনা ও পরবর্তিতে সহিংস রূপ নেয়া, সেই উত্তরটি নির্ভর করছে বিএনপি সরকারের সুশাসন, জামায়াতের পরিপক্ব বিরোধী ভূমিকা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতার উপর। এ উত্তরের অপেক্ষা করতে হচ্ছে এ মুহূর্তে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)