বর্তমান সময়ের দেশীয় শোবিজের অন্যতম আলোচিত নাম তাসনিয়া ফারিণ। পর্দায় চরিত্রের প্রয়োজনে বারবার নিজেকে ভেঙেছেন, গড়েছেন নানা রূপে। কখনো অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত তরুণী, আবার কখনো গ্ল্যামারাস অবয়বে জয় করেছেন দর্শকহৃদয়। তবে ক্যামেরার সামনের সেই ঝলমলে জগতের বাইরে ফারিণ ঠিক কেমন? এসব নিয়ে তিনি কথা বলেছেন নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত পাঠকপ্রিয় দেশ পত্রিকার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলমগীর কবির
প্রশ্ন: সর্বশেষ ঈদে শাকিব খানের সঙ্গে আপনার ‘প্রিন্স’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেল। ছবিটির বাণিজ্যিক ফলাফল যেমনই হোক, শাকিব খানের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ফারিণ: শাকিব খানের সঙ্গে কাজ করা যেকোনো অভিনেত্রীর জন্যই বড় অভিজ্ঞতা। তিনি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির মেগাস্টার। ‘প্রিন্স’ ছবিটিতে আমরা আমাদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। দর্শকরা বড় পর্দায় আমাদের রসায়ন দেখেছেন, এটাই বড় প্রাপ্তি। সিনেমার ব্যবসায়িক সাফল্য অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে, তবে শিল্পী হিসেবে আমি আমার কাজটুকু মন দিয়ে করার চেষ্টা করেছি।
প্রশ্ন: আপনি সামাজিক মাধ্যমে বেশ সরব, কিন্তু আপনাকে রাজনৈতিক বা সামাজিক ইস্যুর চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে বেশি কথা বলতে দেখা যায়। এর বিশেষ কোনো কারণ আছে?
ফারিণ: দেখুন, আমি বিশ্বাস করি আমার কাজের জায়গা আর ব্যক্তিগত জীবন-দুটোরই আলাদা গুরুত্ব আছে। আমি যেভাবে বড় হয়েছি বা যে বিষয়গুলো আমাকে আনন্দ দেয়, সেগুলো ভক্তদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভালো লাগে। আমি চাই মানুষ আমাকে একজন শিল্পী হিসেবে এবং মানুষ হিসেবেও চিনুক। আর রাজনীতি বা বড় ইস্যুতে কথা বলার চেয়ে নিজের চিন্তা ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটানোতেই আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
প্রশ্ন: সম্প্রতি আপনার মেকআপ এবং সাজগোজ নিয়ে একটি ফেসবুক পোস্ট বেশ আলোচনা তৈরি করেছে। বড় হওয়ার দিনগুলোতে নাকি মেকআপ নিয়ে আপনার খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না?
ফারিণ: একদমই তাই। ছোটবেলায় মেকআপ আমার কাছে ছিল শুধুই কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে মায়ের আলমারি থেকে লিপস্টিক খুঁজে বের করা। আমার ড্রেসিং টেবিলে চিরুনি আর পারফিউম ছাড়া কিছুই ছিল না। সত্যি বলতে, মেকআপ করার প্রয়োজনীয়তা আমি কখনোই অনুভব করিনি। প্রকৃতিগতভাবে আমি যেমন, তাতেই আমি খুশি ছিলাম।
প্রশ্ন: শোবিজে আসার পর তো এই ধারণা বদলে যাওয়ার কথা। সেই বদলটা কেমন ছিল?
ফারিণ: হ্যাঁ, এই জগতে আসার পর মেকআপের কারিকুরি বুঝতে শুরু করি। কাজের প্রয়োজনে আমাকে অনেক ধরনের ‘লুক’ ট্রাই করতে হয়েছে কখনো খুব সাধারণ, আবার কখনো ভীষণ ঝলমলে। এটা আমাদের পেশারই অংশ। কিন্তু দিনশেষে আমি অনুভব করেছি, মেকআপ ছাড়া বা খুব হালকা সাজেই আমি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কোথাও ঘুরতে গেলে বা ব্যক্তিগত অবসরে আমি একদম সাধারণ থাকতেই ভালোবাসি।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন কর্মক্ষেত্রে ‘নিখুঁত’ দেখানোর একটা চাপ থাকে। এই চাপ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?
ফারিণ: কর্মক্ষেত্রে গেলে মনের অজান্তেই একধরনের তাগিদ কাজ করে যে, আমাকে নিখুঁত দেখাতে হবে বা একটা নির্দিষ্ট ধাঁচে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে। এটা এক সময় নিজের ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার মতো মনে হয়। তাই আমি ঠিক করেছি, এখন থেকে আমি সেভাবেই নিজেকে তুলে ধরব যেভাবে আমি আত্মবিশ্বাসী। আমি কোনো মেকি মেকআপ বা এমন কোনো ব্যক্তিত্বের মুখোশ পরতে চাই না যা আমার সাথে যায় না।
প্রশ্ন: তার মানে তসনিয়া ফারিণ এখন থেকে শুধু তার নিজের ব্যক্তিত্বকেই প্রাধান্য দেবেন?
ফারিণ: অবশ্যই। আমি শুধু মেকআপের কথা বলছি না, জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমি স্বচ্ছ থাকতে চাই। যা আমার ব্যক্তিত্বের সাথে মেলে না, তা আমি গ্রহণ করব না। আমি বিশ্বাস করি, একজন মানুষ যখন নিজের ভেতর থেকে আত্মবিশ্বাসী থাকে, সেটাই তার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
প্রশ্ন: আপনি প্রচুর ভ্রমণ করেন, দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে আপনাকে দেখা যায়। এই ভ্রমণগুলো কি আপনার এই ‘সাধারণ’ থাকা বা নিজেকে নতুন করে চেনার প্রক্রিয়ায় কোনো ভূমিকা রাখে?
ফারিণ: অনেক বড় ভূমিকা রাখে। ভ্রমণের সময় আমি যখন সম্পূর্ণ নতুন কোনো পরিবেশে বা অচেনা মানুষের মাঝে থাকি, তখন সেখানে তসনিয়া ফারিণ একজন অভিনেত্রী নন, বরং একজন সাধারণ মানুষ। সেখানে নিজেকে নিখুঁত দেখানোর কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। পাহাড় বা সমুদ্রের কাছে গেলে বোঝা যায় কৃত্রিম সাজসজ্জার চেয়ে প্রকৃতি আর নিজের ভেতরের শান্তিটাই আসল। এই অভিজ্ঞতাগুলোই আমাকে শিখিয়েছে যে, বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে নিজের মনের সাথে মিলেমিশে থাকা এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে চলাফেরা করাটাই জীবনের আসল স্বাধীনতা। আর আমি এখন সেই স্বাধীনতাটুকুই উপভোগ করতে চাই।