নতুন নির্দেশনা : গ্রিনকার্ড আবেদনকারীর ইসরায়েল সম্পর্কে অবস্থান জানা হবে


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 29-04-2026

নতুন নির্দেশনা : গ্রিনকার্ড আবেদনকারীর ইসরায়েল সম্পর্কে অবস্থান জানা হবে

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নতুন নির্দেশনার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অভিবাসন কর্মকর্তাদের জন্য জারি করা অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে আবেদনকারীদের রাজনৈতিক মতামত বিশেষ করে ইসরায়েল সম্পর্কিত অবস্থান এখন থেকে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন উপাদান হিসেবে বিবেচিত হবে। এ পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই মানবাধিকারকর্মী সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং আইনি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিনকার্ড বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল আবেদনকারীর আইন মেনে চলা অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকা পারিবারিক সম্পর্ক এবং কর্মসংস্থান। তবে নতুন নীতিমালায় রাজনৈতিক মতামত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য এবং জনসমাবেশে অংশগ্রহণ এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ নথি অনুযায়ী যারা প্রো প্যালেস্টাইন আন্দোলনে অংশ নেন ইসরায়েলের সমালোচনা করেন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় এ ধরনের পোস্ট দেন তাদেরকে ওভারওয়েলমিংলি নেগেটিভ বা অত্যন্ত নেতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে। এ নথি ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে যারা গ্রিন কার্ডসহ বিভিন্ন অভিবাসন আবেদন যাচাই করেন। উদাহরণ হিসেবে একটি পোস্ট উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে লেখা স্টপ ইসরায়েলি টেরর ইন প্যালেস্টাইন এবং ইসরায়েলের পতাকা কেটে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের পোস্টকে সমস্যাজনক বক্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নতুন নীতিমালায় অ্যান্টি আমেরিকান এবং অ্যান্টিসেমিটিক মতাদর্শকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যারা এসব মতাদর্শকে সমর্থন প্রচার বা অনুমোদন করেন তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যানের দিকে ঝুঁকতে হবে। এছাড়া সাবভারসিভ আইডিওলজি বা রাষ্ট্রবিরোধী মতাদর্শ সমর্থনের উদাহরণ হিসেবে এমন ব্যক্তিদের উল্লেখ করা হয়েছে যারা যুক্তরাষ্ট্র সরকার উৎখাতের আহ্বান জানায়। 

এ প্রেক্ষাপটে মার্কিন পতাকা পোড়ানো বা অবমাননাকেও নেতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে যদিও ইউএস সুপ্রিম কোর্ট পূর্বে রায় দিয়েছে যে পতাকা পোড়ানো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ। ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের পরিচালক জোসেফ এডলো কংগ্রেসে বলেন, যারা অ্যান্টি আমেরিকান আইডিওলজিতে বিশ্বাস করে বা টেরোরিস্ট অর্গানাইজেশনকে সমর্থন করে তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে কোনো জায়গা নেই। প্রশাসনের মুখপাত্রদের মতে এ নীতির উদ্দেশ্য ফ্রি স্পিচ সীমিত করা নয়, বরং ন্যাশনাল সিকিউরিটি এবং আমেরিকান ভ্যালুজ রক্ষা করা। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন বলেন এটি আমেরিকান ইনস্টিটিউশন নাগরিকদের সেফটি এবং দেশের ফ্রিডম রক্ষার একটি পদক্ষেপ। 

তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন এ নীতিমালা যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমান্ডা বারান মন্তব্য করেন আইডিওলজিক্যাল স্ক্রিনিং একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত। সমালোচকদের মতে ইসরায়েল সরকারের সমালোচনাকে অ্যান্টিসেমিটিজমের সঙ্গে এক করে দেখা হচ্ছে যা ফ্রি স্পিচকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। এ নীতির অংশ হিসেবে মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রো প্যালেস্টাইন ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত কয়েকজন শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল করেছেন। এমনকি একজন শিক্ষার্থীর ভিসাও বাতিল করা হয়েছে যিনি তার ইউনিভার্সিটির নীতির সমালোচনা করে একটি আর্টিকেল লিখেছিলেন। 

এছাড়া ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিদেশি ট্যুরিস্টদের সোশ্যাল মিডিয়া হিস্ট্রি রিভিউ করার প্রস্তাব দিয়েছে যা ভবিষ্যতে আরো বিস্তৃত মনিটরিংয়ের ইঙ্গিত দেয়। নতুন নীতিমালার প্রভাব ইতোমধ্যে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গ্রিনকার্ড অ্যাপ্রুভালের হার অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে কঠোর ভেটিং প্রসেস এবং আইডিওলজিক্যাল মূল্যায়ন এর প্রধান কারণ। যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন প্রসেসে আইডিওলজি আগে থেকেও একটি বিবেচ্য বিষয় ছিল। উদাহরণস্বরূপ যারা কমিউনিস্ট বা অন্য কোনো টোটালিটারিয়ান রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন কিংবা যারা সহিংস উপায়ে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছেন তাদের গ্রিনকার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা ছিল। তবে পূর্বে কর্মকর্তারা মূলত এমন বক্তব্যের দিকে নজর দিতেন, যা ভায়োলেন্স উসকে দিতে পারে। বর্তমান নীতিমালায় সে সীমা আরো বিস্তৃত করা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের ভেতরেও পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। সংস্থাটি তাদের কর্মকর্তাদের নতুনভাবে হোমল্যান্ড ডিফেন্ডারস নামে অভিহিত করছে। চাকরির বিজ্ঞাপনে লেখা হচ্ছে আপনার মাতৃভূমিকে রক্ষা করুন এবং আপনার সংস্কৃতিকে সুরক্ষিত রাখুন। সমালোচকদের মতে এ ভাষা সংস্থার ভূমিকার পরিবর্তনের প্রতিফলন যেখানে এটি একটি সেবা প্রদানকারী সংস্থা থেকে সিকিউরিটি কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হচ্ছে। 

মানবাধিকার কর্মীদের মতে এ নীতিমালা যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এতে একদিকে যেমন আবেদনকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়বে অন্যদিকে ফ্রি স্পিচ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এর প্রভাব পড়তে পারে কারণ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ফ্রি স্পিচ এবং হিউম্যান রাইটসের প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এ পদক্ষেপ ইমিগ্রেশন নীতিকে নতুন এক দিকনির্দেশনা দিয়েছে যেখানে সিকিউরিটি আইডিওলজি এবং রাজনৈতিক অবস্থান একসঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরো বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। 


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)