যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনে অভিবাসী ভোটারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে নতুন এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ২৮৪টি কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট প্রায় ১৬ মিলিয়ন নিবন্ধিত অভিবাসী ভোটার রয়েছেন, যারা নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারেন। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কেবল নিবন্ধিত ভোটারই নয় মোট যোগ্য অভিবাসী ভোটারের সংখ্যা আরো বেশি, প্রায় ২১ মিলিয়ন। এ সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মোট ৪৬ মিলিয়ন ন্যাচারালাইজড নাগরিকের প্রায় অর্ধেক। ফলে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য এ ভোটার গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনে জয় পরাজয়ের ব্যবধানের তুলনায় অভিবাসী ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে ফ্লোরিডার ২৫তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের কথা উল্লেখ করা যায়। এ জেলায় ২০২২ সালে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ডেবি ওয়াসারম্যান শুল্টজ একটি দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান আসন মাত্র ২৩ হাজার ৯০০ ভোটের ব্যবধানে জয় করেন। ২০২৪ সালেও তিনি প্রায় ৩০ হাজার ৭০০ ভোটের ব্যবধানে আসনটি ধরে রাখেন। কিন্তু এ জেলায় নিবন্ধিত ন্যাচারালাইজড অভিবাসী ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০, যা জয়ের ব্যবধানের তুলনায় চারগুণেরও বেশি। এটি স্পষ্ট করে যে, এ ভোটার গোষ্ঠী নির্বাচনের ফলাফলকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে।
অভিবাসীরা কেবল ভোটার হিসেবেই নয়, অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখছেন। ২০২৪ সালে বিশ্লেষণকৃত ২৮৪টি জেলায় অভিবাসীরা ফেডারেল কর হিসেবে ৪৩৬ বিলিয়ন ডলার এবং অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর হিসেবে মোট ২২৯ বিলিয়ন ডলার প্রদান করেছেন।এছাড়া তাদের হাতে ছিল প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়যোগ্য আয়, যা মূলত খাদ্য, বাসস্থান, গৃহস্থালি পণ্য এবং বিনোদনের মতো খাতে ব্যয় হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে এবং বিভিন্ন খাতে চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, বিশ্লেষণ করা ২৮৪টি ডিস্ট্রিক্টের মধ্যে ১২৬টি ডিস্ট্রিক্ট ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ের ব্যবধানের তুলনায় যোগ্য অভিবাসী ভোটারের সংখ্যা বেশি ছিল। অর্থাৎ এ জেলাগুলোতে অভিবাসী ভোটাররা চাইলে নির্বাচনের ফল পুরোপুরি বদলে দিতে পারতেন। অভিবাসীরা ভোট না দিলেও তাদের উপস্থিতি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণনা সেন্সাসে তাদের গণনা করা হয়, যা কংগ্রেসনাল আসন বণ্টনে প্রভাব ফেলে।
ফ্লোরিডার উদাহরণে দেখা যায়, সাম্প্রতিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির বড় একটি অংশ এসেছে অভিবাসীদের কারণে। এর ফলেই ২০২০ সালের জনগণনার পর স্টেটটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে একটি অতিরিক্ত আসন পেয়েছে। ফ্লোরিডার নতুন ২৮তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে প্রায় ৪ লাখ ৭ হাজার ৫০০ অভিবাসী বসবাস করেন, যা মোট জনসংখ্যার ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রার্থী কার্লোস এ গিমেনেজ ২০২২ ও ২০২৪ সালে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেন।
যুক্তরাষ্টজুড়ে অভিবাসী জনসংখ্যার ঘনত্ব সমান নয়। সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব দেখা যায় উপকূলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে বিশেষ করে ফ্লোরিডা, নিউইয়র্ক এবং ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু ডিস্ট্রিক্টে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্লেষণকৃত ডিস্ট্রিক্টগুলোতে গড়ে ৮৩ দশমিক ১ শতাংশ অভিবাসী তাদের বাড়িতে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলেন। ফলে শুধু ইংরেজি ভাষাভিত্তিক প্রচারণা চালালে অনেক ভোটারকে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এ কারণে রাজনৈতিক প্রচারণায় বহুভাষিক কৌশল গ্রহণ করা জরুরি হয়ে উঠেছে, যাতে অভিবাসী ও দ্বিভাষিক পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অভিবাসীদের বড় একটি অংশ কর্মক্ষম বয়সসীমা ২৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে পড়ে, যা তাদের শ্রমবাজারে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। বিশেষ করে নির্মাণ, কৃষি, উৎপাদন এবং সেবা খাতে অভিবাসী শ্রমিকদের অবদান উল্লেখযোগ্য। এসব খাতের ওপর অনেক কংগ্রেসনাল জেলা নির্ভরশীল, বিশেষ করে যেসব জেলা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। বিশ্লেষণটি ইঙ্গিত দেয় যে, অভিবাসী ভোটারদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা এবং তাদের চাহিদা বোঝা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা এ ভোটার গোষ্ঠীর সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারবে, তাদের নির্বাচনে এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি।
২০২৬ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে অভিবাসী ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। তাদের সংখ্যা, অর্থনৈতিক অবদান এবং সামাজিক প্রভাব সব মিলিয়ে তারা এখন নির্বাচনী রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অভিবাসী ভোটারদের গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং তাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা আর কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং একটি অপরিহার্য কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।