তে ওয়াহিপৌনামুর অরণ্যে


হাবিব রহমান , আপডেট করা হয়েছে : 15-04-2026

তে ওয়াহিপৌনামুর অরণ্যে

নিউজিল‍্যান্ডের চমৎকার শহর অকল‍্যান্ড থেকে আমরা গাড়িতে চেপে যাত্রা শুরু করলাম ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকাভুক্ত ‘তে ওয়াহিপৌনামুর’ অরণ্যের দিকে। এটাকে বলা হয় নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণের ফিয়র্ডের রহস্যময় পৃথিবী। পাহাড়ের ঢাল, সবুজ অরণ্য, এবং নদীর বাঁক-সব মিলিয়ে এক অচেনা সুর বাজছিল মনের গহীনে। আমরা যখন দক্ষিণ দ্বীপের দোরগোড়ায় পৌঁছলাম, ভোরের আকাশ তখনো হালকা কুয়াশায় ঢাকা। আমার সঙ্গে গাইড লোরেনা। গাইড বললো ওর পরিচয়টা অসম্পূর্ণ থেকে যায়; ও যেন এ পাহাড় আর বনেরই এক মানবী রূপ।

অকল্যান্ড থেকে দীর্ঘ যাত্রা শেষে আমরা যখন ‘তে ওয়াহিপৌনামুর’ বিশাল সংরক্ষিত এলাকায় পা রাখলাম, লোরেনা আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বললো, আজকের দিনটা তোমার ভ্রমণের সব থেকে স্মরণীয় হবে। জানো তো, মাওরি ভাষায় ‘তে ওয়াহিপৌনামু’-এর অর্থ ‘সবুজ পাথরের জায়গা’? আমি হেসে বললাম, পাথর জানি না, তবে এ বন আর পাহাড়ের মাঝে আজ আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলতে চাইছি, লোরেনা। ও মিষ্টি করে হাসলো, সে হাসিতে যেন রডোডেনড্রন ফুটে উঠলো।

তে ওয়াহিপৌনামুর গহীন অরণ্য আর হিমবাহের ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা অবাক হয়ে দেখছিলাম আদিম নিউজিল্যান্ডকে। চারদিকে সুউচ্চ পর্বতমালা আর ঘন রেইনফরেস্ট। পাহাড়ের গা বেয়ে নামা ঝরনার শব্দে চারপাশ মুখর। লোরেনা যখন আমাকে কোনো দুর্লভ পাখির ডাক বা গাছের ইতিহাস বুঝিয়ে দিচ্ছিল, আমার সমস্ত মনোযোগ ছিল ওর কথার ছন্দে। মাঝে মাঝে ও থামছে, আমার কাঁধে হাত রাখছে।

লোরেনা জানায়, তে ওয়াহিপৌনামু ১৯৯০ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা লাভ করে। নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত এ বিশাল এলাকাটি প্রায় ২৬ লাখ হেক্টর জমি জুড়ে বিস্তৃত, যা পুরো নিউজিল্যান্ডের স্থলভাগের প্রায় ১০ শতাংশ। এটি হচ্ছে চারটি ন্যাশনাল পার্কের সমন্বয়। এগুলো হচ্ছে মাউন্ট কুক (Aoraki/Mount Cook), ফিওর্ডল্যান্ড (Fiordland) মাউন্ট এসপায়ারিং (Mount Aspiring) ওয়েস্টল্যান্ড তাই পাউটিনি (Westland Tai Poutini)।

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এ অঞ্চলটি প্রাচীন সুপার-কন্টিনেন্ট ‘গন্ডোয়ানা’র (Gondwana) প্রকৃত প্রতিচ্ছবি। কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবী কেমন ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় এখানকার রেইনফরেস্ট এবং আদিম উদ্ভিদের মাঝে। লোরেনা আরো জানায়, এখানকার অন্যতম আকর্ষণ হলো হিমবাহ। বিশেষ করে ‘ফ্রাঞ্জ জোসেফ’ এবং ‘ফক্স গ্লেসিয়ার’ পৃথিবীর বিরলতম কিছু হিমবাহের মধ্যে অন্যতম, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি পর্যন্ত নেমে এসেছে। লোরেনা বলে, মাওরি ভাষায় ‘তে ওয়াহিপৌনামু’ মানে হলো ‘সবুজ পাথরের স্থান’। এখানকার নদীগুলোতে এক বিশেষ ধরনের মূল্যবান সবুজ পাথর (Jade) পাওয়া যায়, যা মাওরিদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। 

এখানে নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত ‘কিউই’ পাখি ছাড়াও দেখা মেলে ‘কেয়া’ (Kea)-যা বিশ্বের একমাত্র পাহাড়ি তোতাপাখি। এছাড়াও বিলুপ্তপ্রায় তোকাহে’ পাখির দেখাও এখানে পাওয়া সম্ভব।

হালকা কুয়াশামাখা পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে লোরেনা হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। সামনেই দিগন্তবিস্তৃত তুষারশুভ্র শৃঙ্গ আর নিচে গভীর সবুজ রেইনফরেস্ট। ও আমার দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ হাসিতে বললো, ‘জানো, ১৯৯০ সালে যখন ইউনেস্কো এ ২৬ লাখ হেক্টর এলাকাকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে, তখন তারা শুধু এর সৌন্দর্য দেখেনি, দেখেছিল পৃথিবীর জন্ম ইতিহাস। এই যে ‘তে ওয়াহিপৌনামু’-এটি আসলে আমাদের আদিম পৃথিবী গন্ডোয়ানা ল্যান্ডের এক জীবন্ত টুকরো।’

আমি অবাক হয়ে ওর চোখের দিকে তাকালাম। ও পাহাড়ের দিকে ইশারা করে আবার বলতে শুরু করলো, মাওরিরা বিশ্বাস করে এই পাহাড়গুলোর প্রাণ আছে। এই যে নদীগুলো দেখছো, এখানেই পাওয়া যায় সেই পবিত্র পৌনামু’ বা সবুজ পাথর। এ পাথর আমাদের কাছে কেবল খনিজ নয়, আমাদের পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ।

দুপুরে এক পাহাড়ি রেস্তোরাঁয় বসে আমরা যখন স্থানীয় ‘নিউজিল্যান্ড ল্যাম্ব’ আর ভেষজ সালাদ দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারছিলাম, তখন লোরেনা আমার খুব কাছে এসে বসলো। ওর হাতে রাখা জলের গ্লাসে বিকালের রোদের প্রতিচ্ছবি। ও ফিসফিস করে বললো, ‘তুমি তোমার বইয়ে যখন এই জায়গার কথা লিখবে, তখন শুধু হেরিটেজ সাইটের তথ্য দিও না। লিখো যে, এখানে এলে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে নিজের আত্মার সংযোগ খুঁজে পায়। যেমনটা আমি তোমার সঙ্গে খুঁজে পেয়েছি।’

বিকালের আলো যখন পাহাড়ের গায়ে সোনা ছড়িয়ে দিচ্ছে, আমরা গিয়ে বসলাম, শান্ত এক লেকের ধারের ছোট্ট ক্যাফেতে। চারদিকে বরফাবৃত পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি তখন স্থির জলে। দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি আর কুকিজ আমাদের সামনে। লোরেনা কফির কাপে চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকাল। ওর কাজল কালো চোখে তখন বিদায়ের সুর না কি আগামীর স্বপ্ন, তা বোঝা দায়। আমি ওর হাতের ওপর হাত রেখে বললাম, ‘লোরেনা, অকল্যান্ড থেকে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া সার্থক হয়েছে শুধু তোমার জন্য।’ ও ওর চপল হাসিতে উত্তর দিল, ‘তুমি পাশে থাকলে এই কঠিন পাহাড়ি পথও আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়।’

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। কুয়াশা যখন বনের গভীরে নামছে, আমরা ফেরার পথ ধরলাম। তে ওয়াহিপৌনামুর এ আদিম সৌন্দর্য আর লোরেনার সঙ্গে কাটানো সেই রোমান্টিক মুহূর্তগুলো আমার স্মৃতির পাতায় এক চিরস্থায়ী সম্পদ হয়ে রইলো। আমি ওর চোখের মণি আর দূরে পাহাড়ের চূড়ায় জমে থাকা বরফের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম-সত্যিই তো, কালের সাক্ষী হয়ে এই পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে আছে কোটি বছর ধরে, আর আমরা কয়েক ঘণ্টার জন্য এখানে এসে চিরকালের বন্ধনে জড়িয়ে গেলাম।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)