জোহরান মামদানির প্রথম ১০০ দিন


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 15-04-2026

জোহরান মামদানির প্রথম ১০০ দিন

নিউ ইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি নতুন বছরের প্রথম দিনে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, উচ্চাকাক্সক্ষা এবং পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিন পর দেখা যাচ্ছে, তার কিছু পরিকল্পনায় অগ্রগতি হলেও কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবতার কারণে তাকে অবস্থান নরম করতে হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মামদানি শহরের দৈনন্দিন সমস্যার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। রাস্তার গর্ত মেরামত, কর্মক্ষেত্রের নিয়মকানুন বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন বিষয়কে তিনি অগ্রাধিকার দেন। শহরের বিভিন্ন স্থানে সংবাদ সম্মেলনে তিনি একটি বড় ক্যালেন্ডার নিয়ে উপস্থিত হয়ে তার প্রশাসনের অগ্রগতি তুলে ধরেন। তার ভাষায়, অনেক সময় নিউ ইয়র্কবাসী মনে করেন সিটি হল তাদের জীবনের সমস্যার প্রতি উদাসীন। আমরা এমন একটি প্রশাসন গড়তে চাই যা উচ্চাকাক্সক্ষী, স্পষ্টবাদী এবং নিরলসভাবে কাজ করে।

৩৪ বছর বয়সী এ ডেমোক্রে‍টিক সোশ্যালিস্ট নেতা শহরের জন্য নতুন যুগ আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন তিনি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাজেট সংকট এবং প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি। তার বড় প্রতিশ্রুতিগুলোর অনেকগুলোই এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। শহরের প্রায় ১০ লাখ ভাড়া নিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া স্থগিত করার বিষয়টি এখনো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। যদিও তিনি রেন্ট গাইডলাইন বোর্ডে নিজের অনুকূলে সদস্য নিয়োগ করতে পেরেছেন, তবুও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। অন্যদিকে তার অন্যতম আলোচিত প্রতিশ্রুতি-বিনামূল্যে বাস সেবা চালু করা-এ বছর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। রাজ্যের আইনপ্রণেতারা বাজেটে এ প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি না হওয়ায় পরিকল্পনাটি পিছিয়ে গেছে। একইভাবে শহরের প্রতিটি বরোতে সরকারি মালিকানাধীন মুদি দোকান চালুর পরিকল্পনাও এখনই বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম।

তবে শিশু যত্ন খাতে তার উদ্যোগকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। গভর্নর ক্যাথি হোচুলের সহায়তায় ‘২-কে’ নামে একটি চাইল্ড কেয়ার কর্মসূচি চালু হচ্ছে, যার জন্য ৭৩ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে প্রায় ২ হাজার শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং ভবিষ্যতে এটি ১২ হাজার শিশুর মধ্যে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও পুরোপুরি সার্বজনীন চাইল্ড কেয়ার ব্যবস্থা বাস্তবায়নে আরো অর্থায়ন প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। ২০২৫ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে প্রায় ২০ হাজার চাকরি কমেছে বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আগের মেয়রদের তুলনায় মামদানি এখনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় জোর দেননি বলে সমালোচনা রয়েছে। তবে নগর ব্যবস্থাপনার দৈনন্দিন কার্যক্রমে তিনি সক্রিয় রয়েছেন। রাস্তার গর্ত মেরামত, নির্বাহী আদেশ জারি, বেলভিউ হাসপাতালে দীর্ঘদিনের বিলম্বিত চিকিৎসা কেন্দ্র চালু, তীব্র শীত মোকাবিলা এবং রমজানে ইফতার আয়োজনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে তার অংশগ্রহণ লক্ষ করা গেছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই শহর নিজেই গতির নির্ধারক, আর নিউ ইয়র্কবাসীও তাই। এখন সরকারের কাজ হলো সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা।

জনমত জরিপে তার জনপ্রিয়তা মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, তার অনুমোদনের হার ৪৮ শতাংশ, যা তার পূর্বসূরি এরিক অ্যাডামসের তুলনায় কম। তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে-প্রায় ৭৫ শতাংশ নাগরিক তাকে পরিশ্রমী মনে করেন এবং ৬১ শতাংশ তাকে ভালো নেতৃত্বদাতা হিসেবে দেখেন।

ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক

মামদানির প্রশাসনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক। নির্বাচনের আগে ট্রাম্প কঠোর ভাষায় তার সমালোচনা করলেও পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা যায়। ফেব্রুয়ারিতে মামদানি গোপনে ওয়াশিংটন ডিসিতে সফর করেন। ওই সফরের পর ওভাল অফিসে তোলা একটি ছবি প্রকাশ পায়, যেখানে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে মামদানিকে দেখা যায়। ছবিতে ট্রাম্প দুটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতা হাতে ধরে ছিলেন-একটি ‘ফোর্ড টু সিটি : ড্রপ ডেড’, অন্যটি ‘ট্রাম্প টু সিটি : লেটস বিল্ড।’

মামদানি দাবি করেন, তিনি ট্রাম্পকে কুইন্সের সানিসাইড ইয়ার্ড এলাকায় ১২ হাজার সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন নির্মাণ প্রকল্পে আগ্রহী করতে সক্ষম হয়েছেন। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল অনুদান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান। এছাড়া এ বৈঠকের মাধ্যমে তিনি অভিবাসন হেফাজতে আটক থাকা দুজন ক্যাম্পাস অ্যাকটিভিস্টের মুক্তি নিশ্চিত করেন, যা তার সমর্থকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

বাজেট সংকট ও রাজনৈতিক সমন্বয়

নিউ ইয়র্ক শহর বর্তমানে প্রায় ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতির মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে একদিকে তাকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার অনেক পরিকল্পনা রাজ্য সরকারের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তিনি গভর্নর হোচুল ও আলবানির আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। তবে বাজেট ঘাটতি পূরণে প্রপার্টি ট্যাক্স বাড়ানোর ইঙ্গিত দিলে সিটি কাউন্সিলের সঙ্গে তার মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।

বামপন্থী অবস্থান থেকে কিছু সরে আসা

মামদানি তার কিছু কঠোর বামপন্থী অবস্থান থেকেও সরে এসেছেন বলে সমালোচনা রয়েছে। তিনি নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগের কিছু ইউনিট বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেননি। একইভাবে, গ্যাং ডাটাবেস বাতিলের পরিকল্পনাও তিনি শিথিল করেছেন। তবে তার সমর্থকদের মতে, তিনি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। ‘অফিস অব কমিউনিটি সেফটি’ গঠনসহ কিছু সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।সব মিলিয়ে, জোহরান মামদানির প্রথম ১০০ দিনকে উচ্চাকাক্সক্ষা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার সময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে তিনি বড় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ধরে রেখেছেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে ধীর গতিতে এগোতে বাধ্য করছে। ভবিষ্যতে তার নেতৃত্ব কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে এই চ্যালেঞ্জগুলো তিনি কীভাবে মোকাবিলা করেন তার ওপর।

নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি প্রথম ১০০ দিনে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজমে দৃঢ় অবস্থান নিলেন

নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি তার দায়িত্ব গ্রহণের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ভাষণে স্পষ্টভাবে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজমের পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ১২ এপ্রিল কুইন্সের নকডাউন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে তিনি তার প্রশাসনের প্রাথমিক সাফল্য তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও ঘোষণা করেন। রোববার অনুষ্ঠিত আয়োজনে শত শত সমর্থক ও সিটিকর্মী অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি রাজনৈতিক উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও উপস্থিত ছিলেন, যিনি মামদানির নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।

মামদানি বলেন, ১ জানুয়ারি আমি নিউ ইয়র্কবাসীকে বলেছিলাম, সিটি হলের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে এই শহরকে আরো বেশি মানুষের জন্য উপযোগী করে তোলা। ১০২ দিনের মধ্যে আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করেছি। এটি সরকারের পরিবর্তন এবং ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজমেরই বাস্তব রূপ। তিনি তার প্রশাসনের প্রাথমিক অর্জনের মধ্যে নতুন শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র চালু, বাস সার্ভিসের গতি বৃদ্ধি এবং নগর পরিষেবার উন্নয়নকে তুলে ধরেন। তার মতে, এই পরিবর্তনগুলোই প্রমাণ করে যে সামাজিক নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করা সম্ভব।

অনুষ্ঠানে মামদানি তার রাজনৈতিক দর্শনকে পোথোল পলিটিকস হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার ভাষায়, শহরের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো যেমন রাস্তার গর্ত মেরামত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, এ ছোট ছোট কাজগুলোই নাগরিকদের আস্থা পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি। তিনি বলেন, যারা সন্দেহ করেন, আমরা তাদের জন্যও রাস্তার গর্ত ঠিক করব। সমাজতান্ত্রিকরা যখন প্রতিশ্রুতি দেয়, তারা তা বাস্তবায়ন করে। মামদানি আরো জানান, শহরের প্রতিটি বরোতে একটি করে সিটি-ওনড গ্রোসারি স্টোর চালুর পরিকল্পনায় অগ্রগতি হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রথম স্টোরটি আগামী বছর ম্যানহাটনে চালু হতে পারে। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার।

তিনি দাবি করেন, সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বাজার বেসরকারি করপোরেট ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সাশ্রয়ী দামে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে। তিনি বলেন, যদি কেউ মনে করেন সরকারি ব্যবসা কাজ করে না, আমি তাদের বলি, প্রতিযোগিতা হোক, সবচেয়ে সাশ্রয়ী বাজারই জয়ী হবে।

তবে তার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। বাজেট ঘাটতি, কিছু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং নীতিগত বিতর্ক তাকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে। যদিও সমর্থকরা বলছেন, তিনি ধীরে হলেও শহর পরিচালনায় নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করছেন। মামদানি প্রশাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার রাজনৈতিক পরিচয়। তিনি বলেন, আমি একজন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি এবং আমি সেই আদর্শ অনুযায়ীই শাসন করব।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, আমি বহু মেয়রের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করেছি, কিন্তু এই প্রথম কেউ গর্বের সঙ্গে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজমের কথা বলছে। বিশ্লেষকদের মতে, মামদানির প্রথম ১০০ দিন তার রাজনৈতিক দর্শনকে প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে মেলানোর একটি প্রাথমিক পর্যায়। একদিকে তিনি সামাজিক ন্যায়ের নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে শহরের জটিল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো তাকে ধীরে অগ্রসর হতে বাধ্য করছে। সব মিলিয়ে, মামদানির প্রথম ১০০ দিন নিউ ইয়র্কের রাজনীতিতে নতুন ধরনের বামপন্থী পরীক্ষার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে শহরের শাসনব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)