ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা নতুন সরকার তথা বর্তমান বিএনপি সরকারকে বিপদে ফেলেছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে কোনো বাছবিচার না করেই ঢালাওভাবে হাসিনা সরকারের প্রশাসনকে পরিবর্তন করে নিজেদের আপনজন এবং জামায়াতি ঘরানার অদক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে সাজিয়েছিল ইউনূস প্রশাসন। ১৮ মাসে সরকার জ্বালানি বিদ্যুৎ এবং যোগাযোগ খাতের অতি প্রয়োজনীয় কয়েকটি প্রকল্পের শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বর্তমান সংকট সময়ে নতুন সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া জটিল হয়ে পড়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশে ডিজেল, অকটেনের জন্য পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন। অনেকে দুদিন-আড়াই দিন বসেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন না। এতে করে দেশের প্রতিটা উন্নয়ন সেক্টরের কাজ স্থবির হয়ে গেছে। ট্রাক, ভেকু, নির্মাণসামগ্রী স্থানান্তর করার বাহন থেকে শুরু করে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলারসমূহও চুপচাপ বসে আছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন, শিপমেন্ট ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে যেমন বৈদেশিক কমিটমেন্ট ঠিক রাখতে শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে। তেমনি চরম বিরক্ত হচ্ছেন ক্রেতারাও। যা দেশের অর্থনীতির ওপর ভীষণ চাপ পড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে সরকারবিরোধী একটি চক্রের সুযোগ বুঝে ক্রাইসিস তৈরি করা, উচ্চদামে বিক্রির মতো নির্লজ্জ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে আছে বড় একটি চক্র। সব মিলিয়ে নতুন সরকারের ওপর বড় একটা চাপ তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে সংসদেও বিরোধীদের যথেষ্ট তিরস্কার শুনতে হচ্ছে। সঠিক পরিস্থিতি না বুঝে জনগণকে বিভ্রান্ত করেই চলছে একটি বড় চক্র।
অথচ আপন গতিতে চললে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট, গভীর সাগর থেকে মহেশখালী হয়ে পতেঙ্গা পর্যন্ত নির্মিত এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) চালু থাকলে জ্বালানি বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকতো। ইউনূস সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সামিট গ্রুপের সঙ্গে স্বাক্ষরিত তৃতীয় এফেসারু বাতিল হয়েছে। না হলে বাংলাদেশ ২০২৭ আরো ৫০০ এমএমসিএফডি এলএনজি আমদানির সক্ষমতা অর্জন করতো। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনের পর সরকারে এসেই মহাবিপদে পড়েছে বিএনপি সরকার।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
রাশিয়ার কারিগরি আর আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ২x১২০০ =২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ভিভিআর ১২০০ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি শেখ হাসিনা সরকারের সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনায় নির্মাণের শেষ পর্যায়ে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমেই প্রকল্পে হাসিনা পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বন্ধু দেশ রাশিয়ার সঙ্গে জটিলতা সৃষ্টি করে। তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন করে প্রকল্পের স্বাভাবিক অগ্রগতি স্থবির করে ফেলে। অনেকের ধারণা প্রকল্পের কিছু জরুরি যন্ত্রপাতি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে থাকা অবস্থায় আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হয়। অথচ স্বাভাবিক গতিতে কাজ চললে রূপপুর থেকে অন্তত ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এখন জাতীয় গ্রিডে পাওয়া যেতো। বিদ্যমান জ্বালানি সংকটের সময় সেটি অনেক কার্যকর হতো।
গভীর সাগর থেকে মাতারবাড়ী হয়ে পতেঙ্গা পর্যন্ত নির্মিত এসপিএম প্রকল্প
সবাই জানে চট্টগ্রাম বন্দরের নাব্য সীমিত থাকায় জ্বালানি তেলবাহী বড় জাহাজগুলো গভীর সাগওে নোঙর করে ছোট ছোট জাহাজে জ্বালানি তেল পতেঙ্গায় পাঠায়। এ প্রক্রিয়ায় সময় অপচয় হয়, জ্বালানি অপচয় হয় এমনকি ছোট পরিবহনগুলোর জন্য বাড়তি জ্বালানি প্রয়োজন হয়। ইউনূস সরকার ১৮ মাস সময়েও শেষ হওয়া এ প্রকল্পটি চালু করতে পারেনি। এ প্রকল্প চালু থাকলে বড় জাহাজগুলো ন্যূনতম সময়ে জ্বালানি খালাস করে ফিরে যেতে পারতো। মহেশখালী এবং পতেঙ্গায় আপৎকালীন রিজার্ভ সংরক্ষণ করা যেতো। ইউনূস সরকার বিপিসির শীর্ষ পর্যায়ে অদক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ায় তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। এমনকি বর্তমান জ্বালানি সংকটের শুরুতে বিপিসির ভুল সংকেতে সরকারের জ্বালানি রেশনিং ভুল সিদ্ধান্ত আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
ইউনূস সরকার হাসিনা সরকারের যে সব প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির ধুয়া তুলেছিল সেগুলো কিন্তু আপৎকালীন সময়ে বিশাল অবদান রাখছে। ভারতের নুমালিগড় থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত নির্মিত তরল জ্বালানিবাহী পাইপলাইন দিয়ে আসছে বিপৎকালীন সময়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ডিজেল, আদানি গ্রুপের ঝাড়খণ্ড বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ভারত থেকে আসছে বিদ্যুৎ আর সে অনেকের মতে তথাকথিত সুন্দরবন বিধ্বংসী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মিলছে ন্যূনতম ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
অথচ শেখ হাসিনার এসব প্রকল্পের যারা চিৎকার করে বিরোধিতা করে আসছিল, আন্দোলন করে আসছিল। সুশীলরা যারা একের পর এক বিষোদগার করে আসছিলেন, এখন তারা চুপ। ভারত থেকে কেন ডিজেল ও প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ আনা হচ্ছে, এ নিয়ে তাদের মুখে তালা। শেখ হাসিনার শতসমস্যা ছিল। কিন্তু ড. ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর সেসব সমস্যা ছিল না। তাহলে কেন ইউনূস সরকার সাগর এবং স্থলভাবে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য পরিবর্তী সময়ে মডেল পিএসসি ডকুমেন্ট অনুমোদন করে গেল না? কেন নতুন এফেসারেও চুক্তি করলো না? কেন মাতারবাড়ী ল্যান্ড বেজড এলএনজি টার্মিনাল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলো না? ১৮ মাস কিন্তু একেবারে কম সময় ছিল না। ব্যর্থ ইউনূস সরকার কিন্তু শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশ বিরোধী চুক্তি করে নতুন সরকারের জন্য বিশাল সংকট তৈরি করে গেছে।
আশা করি সরকার দ্রুত এখানে আলোচিত বিষয়গুলো নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বাস্তবতা হলো এই যে, কথা অনেকেই বলে কিন্তু কাজ করে দেখানোর সামর্থ বা যোগ্যতা সবার থাকে না।
চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তি নেই
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের চূড়ান্ত যুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান চতুর্মুখী সংকট প্রশমিত হবে না। যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়ায় সারা বিশ্বজুড়ে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট, অর্থনৈতিক সংকট সর্বগ্রাসী রূপ নিচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধ হলেও ইতিমধ্যে সৃষ্ট জটিল ক্ষতগুলো উপশম করে ঘুরে দাঁড়াতে অনেক সময় লাগবে।
বাংলাদেশের মত ক্রমাগত নিরংকুশ আমদানিকৃত জ্বালানি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া দেশের পক্ষে সংকট সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জগুলো অনেক গভীর আর বহুমুখী। মাত্র দেড় মাস আগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের পক্ষে আরো কঠিন।
এমনিতেই ভঙ্গুর অর্থনীতি আর জ্বালানি সংকটে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশের নতুন সরকারের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন ছিল। তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এসেছে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে। জ্বালানি মূল্য আকাশ ছুঁয়েছে, সাপ্লাই চেইন সংকুচিত হয়ে আছে। সংকটের শুরুতে সাপ্লাই চেইনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগেই তড়িঘড়ি জ্বালানি সরবরাহ রেশনিং করার ঘোষণা দেওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে জনগণ প্যানিক ক্রয় শুরু করে। অশুভ সিন্ডিকেট মজুত করে জ্বালানি সরবরাহে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সরকার ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি আমদানি এবং সরবরাহ চেইন নিবিড় তদারকি করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের অনেক পেট্রল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের সামনে প্রতিদিন গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। জেলেরা ডিজেল সংকটের কারণে ট্রলার নিয়ে সাগরে যেতে পারছে না। দেশজুড়ে নিত্যপণ্যের চলাচলে বাড়তি খরচ হওয়ায় দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে। বোরো মৌসুমে সেচের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
এমন অবস্থায় পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘ মন্দ দেখা দেবে। চলমান গ্রীষ্মে তীব্র দাবদাহের সময় বিদ্যুৎ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল না। বর্তমান সংকটের সময় বাংলাদেশ ১৪০০০-১৫০০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করতেই হিমশিম খাবে। গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ সার কারখানা বন্ধ আছে। শুরু হয়েছে বোরো মৌসুম। সেচের জন্য ডিজেল, বিদ্যুতের মতো সারের চাহিদা সময় মত মেটাতে হবে। সরকার জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রতার জন্য কিছু দূরদর্শী ব্যবস্থা চালু করার পরেও হয়তো দিনে ৪-৬ ঘণ্টা পরিকল্পিত লোডশেডিং করতে হতে পারে। শুনছি এবারের গ্রীষ্মে কয়েক দফা দাবদাহ হবে।
সরকার কিন্তু এখন পর্যন্ত জেট অয়েল আর এলপিজি ছাড়া জ্বালানি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করেনি। মে মাসের শুরু থেকে সব জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া বিকল্প থাকবে। ফলশ্রুতিতে মূল্যস্ফীতি আর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপ সইতে হবে।
সরকার জ্বালানি সংকট এবং সার্বিক পরিস্থিতিকে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে সংকট মোকাবিলা করতে হবে। সরকারের কোন অবিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্তে জাতীয় সংহতি ব্যাহত হয় তাহলে কিন্তু সরকার বিব্রত বিপর্যস্ত হতে পারে।
আশা করি, যুদ্ধবাজ দেশগুলোর শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। নাহলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে বাংলাদেশ তো এমনিতেই শামিল হয়ে আছে। ফলে ওই ধারাবাহিকতায় এমনকি খাদ্য সংকট থেকে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।