১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংগরিষ্ঠতা অর্জনকারী বিএনপি জোট সরকার মাত্র দুই মাসেই নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের সংকট ডেকে আনছে। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আরব এবং পারস্য মহাসাগরীয় অঞ্চলে চলমান ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও পড়েছে তীব্র জ্বালানি আর অর্থনৈতিক সংকটে। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেই সরকারি দফতর এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শের ব্যক্তিদের এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদায়ন করে স্বজনপ্রীতির পূর্ব ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেই চলেছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদেও কিছু বিতর্কিত বিল পাস করিয়েছে যেগুলো নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মত অঙ্গীকারের পরিপন্থী। সংসদের ভেতরে শক্তিশালী বিরোধী দলের সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে সংঘাতময় পরিস্থিতি। তদুপরি অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক জারিকৃত আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ সংগঠনগুলোর রাজনৌতিক কার্যক্রম অসংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করার অর্ডিন্যান্সকে আইনি রূপ দিয়ে দলটির সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
২০২৪ জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং মামলাবাজির অভিযোগ উঠেছিল। ক্ষেত্রবিশেষে মব সন্ত্রাসেও তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি জনতার কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে তারা স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠে মেধার ভিত্তিতে জনসাধারণের জন্য সমঅধিকার এবং সাম্য সৃষ্টি করবে। কিন্তু জনগণের সঙ্গে ওয়াদার বরখেলাপ করে নির্বাচনের পরই সরকার সারা দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে দলঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়োগ করলো ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে, সিটি কাউন্সিল এবং মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলগুলোতে নিয়োগ দিলো নিজেদের দলীয় লোক। শেখ হাসিনা নেতৃত্বের আওয়ামী সরকারের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ছিল, বিএনপিও তাই করছে।
নির্বাচিত দলের কাছে আকাঙ্ক্ষিত ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মামলা বাণিজ্যে ঢালাওভাবে গ্রেফতারকৃত অসংখ্য নিরাপরাদ ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়ে দেশে শান্তি এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। কিন্তু নির্বাচিত হয়েই সরকার সম্পূর্ণ ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত অবস্থানে ঘুরে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে সূচিত হত্যাকাণ্ডসমূহের নিরপেক্ষ তদন্তের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ হচ্ছে না। ১৯৭২ সংবিধান ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সরকার একের পর এক জনবিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ১৯৭১ অথবা ২০২৪ দুটি অর্জনকেই বিসর্জন দিচ্ছে। বিএনপির অনেক পোড় খাওয়া বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ থাকলেও দলের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বর্তমান গভীর সঙ্কট মুহূর্তে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে সরকার। ক্ষেত্রবিশেষে সরকারকে অসহিষ্ণু মনে হচ্ছে। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, প্রভাবশালী প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃস্থাপন। বাংলাদেশ কখনো ভারতের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক বজায় রেখে স্বস্তিতে থাকবে না। ইউনূস সরকার ক্ষমতায় থাকা সময়ের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে একতরফা চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতিকে সংকুচিত করে গেছে।
১৮ মাসে দেশ জুড়ে মামলা বাণিজ্য, মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ছাড়াও হয়েছে দুর্নীতি। নতুন সরকার যদি ঈশান কোনে মেঘ দেখেও সতর্ক হয়ে নিজেদের সংশোধন না করে তাহলে কিন্তু পরিণতি শুভ হবে না। এমনকি জ্বালানি সংকটে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট সামাল দেওয়াই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আমরা শান্তিপ্রিয় আমজনতা নতুন করে সংঘাত চাই না। চাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশপ্রেমিক গোষ্ঠীর নেতৃত্বে মেধাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। সব দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হোক। তারুণ্যের সৃজন শক্তি কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।