সাজ্জাদুর রহমানকে সিটিজেনশিপ ইন্টারভিউতে গ্রেফতার ও ডিপোর্টেশন


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 15-04-2026

সাজ্জাদুর রহমানকে সিটিজেনশিপ ইন্টারভিউতে গ্রেফতার ও ডিপোর্টেশন

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি অবস্থান করার পর দেশ ত্যাগ করলে পুনরায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। অভিবাসন আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ১৮০ দিনের বেশি কিন্তু এক বছরের কম সময় অবৈধভাবে অবস্থান করেন, তবে তার ওপর সাধারণত তিন বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। আর কেউ যদি এক বছরের বেশি সময় অবৈধভাবে অবস্থান করেন, তবে তার ক্ষেত্রে দশ বছরের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। এই বিধানটি ১৯৯৬ সালের ইমিগ্রেশন সংস্কার আইনের অংশ হিসেবে চালু হয় এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় পরিণত হয়েছে। ভিজিট বা অন্য যেকোনো ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে এবং পরে দেশ ত্যাগ করলে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে পারে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট কর্তৃপক্ষ তিন ও দশ বছরের এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের বিষয়গুলো নিয়ে নজরদারি ও নোটিশ প্রদান বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে গ্রিন কার্ডধারীদের নাগরিকত্ব আবেদন প্রক্রিয়ায় অতীত অভিবাসন ইতিহাস যাচাই করে গ্রিন কার্ড বাতিলের মতো পদক্ষেপ এবং ইমিগ্রেশন কোর্টে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এমঈন এক ঘটনায় নিউ ইয়র্কের আলবানি শহরে বসবাসকারী বাংলাদেশি প্রবাসী সাজ্জাদুর রহমান নাগরিকত্ব পরীক্ষার ইন্টারভিউয়ের সময় জটিলতার মুখে পড়েন বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার পূর্ববর্তী অভিবাসন ইতিহাসে দীর্ঘ সময় অবৈধ অবস্থান থাকায় এবং পুনঃপ্রবেশ নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত শর্ত পূরণ না করায় তার নাগরিকত্ব আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাজ্জাদুর রহমান ২০০০ সালে ভিজিট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় অবৈধভাবে অবস্থান করেন। ২০০২ সালে তিনি স্পেশাল রেজিস্ট্রেশনের সময় নিবন্ধন সম্পন্ন করেন এবং পরে বাংলাদেশে ফিরে যান। পরবর্তীতে তার মেয়ে কর্তৃক পরিবারিক আবেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি স্ত্রীসহ ইমিগ্র‍্যান্ট ভিসা পেয়ে ২০১৭ সালে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। এরপর তিনি দীর্ঘদিন লং আইল্যান্ড এবং পরে আলবানি এলাকায় বসবাস করেন। তিনি একটি বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে এক্সেকিউটিভ পদে চাকরি করতেন এবং পরে আলবানিতে দুটি বাড়ি ক্রয় করেন বলে জানা যায়।

নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যানের পর তিনি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন এবং পুনর্বিবেচনার আবেদন জানান। ২৫ মার্চ তাকে ইমিগ্রেশন অফিসে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়। সেখানে পূর্ববর্তী অভিবাসন ইতিহাস ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত প্রশ্নে জটিলতা দেখা দেয়। সূত্র অনুযায়ী, তিনি দাবি করেন যে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ভিসা প্রদানের সময় তাকে ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি। তবে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তার ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে তাকে আটক করেন এবং ডিটেনশন সেন্টারে পাঠান। পরবর্তীতে ১০ এপ্রিল তাকে বাংলাদেশে ডিপোর্ট করা হয় বলে জানা গেছে।

ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে অবৈধ অবস্থানজনিত নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং পরবর্তী ভিসা বা গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়ায় পূর্ববর্তী রেকর্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যুক্তরাষ্ট্রের তিন ও দশ বছরের নিষেধাজ্ঞা : পরিবারভিত্তিক অভিবাসনে জটিলতা ও সমাধানের পথ

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বহুল আলোচিত তিন ও ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘদিন ধরে পরিবারভিত্তিক অভিবাসন প্রক্রিয়ায় একটি জটিল ও বিতর্কিত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে যারা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দাদের পরিবারের সদস্য, তাদের জন্য এ আইন প্রায়শই একটি কঠিন বাস্তবতার সৃষ্টি করে। সাধারণভাবে অনেকেই মনে করেন যে একজন মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করলে বা নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে সহজেই গ্রিনকার্ড পাওয়া যায়, কিন্তু বাস্তবে আইনি জটিলতা ও বিধিনিষেধের কারণে সেই পথ অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে তিন ও ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করে, যা অনেক অভিবাসীকে এক ধরনের ‘ক্যাচ-২২’ পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়।

এ আইন অনুযায়ী, যারা যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি অবস্থান করেছেন এবং পরে দেশ ত্যাগ করেন, তারা পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষিদ্ধ হন। যদি কেউ ১৮০ দিনের বেশি কিন্তু এক বছরের কম সময় অবৈধভাবে অবস্থান করেন, তবে তাকে তিন বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়। অন্যদিকে যদি কেউ এক বছরের বেশি সময় অবৈধভাবে অবস্থান করেন, তবে তার ওপর ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই বিধানটি ১৯৯৬ সালের ইমিগ্রেশন আইন সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রবর্তিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে এটি অভিবাসন আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এ নিষেধাজ্ঞার মূল সমস্যা হলো, এটি এমন অভিবাসীদের জন্য গুরুতর বাধা সৃষ্টি করে যারা আইনগতভাবে তাদের অবস্থান ঠিক করতে চান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং তার পরিবারের কেউ মার্কিন নাগরিক বা গ্রিন কার্ডধারী। তিনি আইন অনুযায়ী গ্রিনকার্ড পাওয়ার যোগ্য হলেও তাকে সে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে নিজ দেশের মার্কিন দূতাবাসে যেতে হয়। কিন্তু একবার দেশ ছাড়লেই তার ওপর তিন বা ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়ে যায়। ফলে তিনি হয়তো বছরের পর বছর তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, অথবা ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রেই থেকে যান।

এ জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার কিছু ক্ষেত্রে ‘ওয়েভার’ বা বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রেখেছে। এ ছাড় পাওয়ার জন্য আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হয় যে, যদি তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসতে না দেওয়া হয়, তাহলে তার মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা স্বামী/স্ত্রী বা পিতা-মাতা চরম কষ্ট বা এক্সট্রিম হার্ডশিপের সম্মুখীন হবেন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে আবেদনকারীর নিজের কষ্ট বা তার সন্তানের কষ্ট সাধারণত এ বিবেচনার মধ্যে পড়ে না। এ সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক আবেদনকারীই এ ছাড় পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন।

আগে এ ওয়েভারের জন্য আবেদন করতে হলে ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অবস্থান করতে হতো, যা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াত। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মাস থেকে এক বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারত। ফলে পরিবারগুলো অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেত এবং তাদের জন্য এটি মানসিক ও আর্থিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠতো।

এ সমস্যার সমাধানে ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করে, যা প্রভিশনাল ওয়েভার নামে পরিচিত। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই আগামভাবে ওয়েভারের জন্য আবেদন করতে পারেন। যদি তারা এ প্রাথমিক অনুমোদন পান, তাহলে তারা পরে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে কনস্যুলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন এবং তুলনামূলকভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে আবার দেশে ফিরে আসতে পারেন। এ পরিবর্তনের ফলে পরিবারগুলোর বিচ্ছিন্নতার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি কিছুটা হলেও সহজ হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে এ প্রভিশনাল ওয়েভার ব্যবস্থায় আরো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শুধু পরিবারভিত্তিক আবেদনকারী নয়, বরং কর্মসংস্থানভিত্তিক, বৈচিত্র‍্য ভিসা (ডাইভারসিটি লটারি) এবং অন্যান্য ক্যাটাগরির আবেদনকারীরাও এ সুবিধার আওতায় আসেন, যদি তারা প্রমাণ করতে পারেন যে, তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের নিকটাত্মীয় চরম কষ্টে পড়বেন। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে যাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কার বা ডিপোর্টেশনের আদেশ রয়েছে, তারাও নির্দিষ্ট শর্তে এ প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে পারেন।

তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে, প্রভিশনাল ওয়েভার পাওয়া মানেই গ্রিনকার্ড নিশ্চিত নয়। আবেদনকারীকে এখনো অন্য সব যোগ্যতা পূরণ করতে হয় এবং যদি অন্য কোনো কারণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়, তবে তার আবেদন বাতিল হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ পূর্বে ডিপোর্ট হওয়ার পর অবৈধভাবে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন, তবে তার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হতে পারে।

এক্সট্রিম হার্ডশিপ বা চরম কষ্টের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে অস্পষ্ট ছিল এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রয়োগে অসংগতি দেখা গেছে। এ সমস্যার সমাধানে ২০১৬ সালের শেষের দিকে নতুন নির্দেশিকা জারি করা হয়, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে চরম কষ্ট বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায় যা সাধারণ কষ্টের চেয়ে বেশি এবং যা সাধারণত ডিপোর্টেশন বা বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে দেখা যায় তার বাইরে। এ নির্দেশিকায় সামাজিক, অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্যগত এবং সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।

এখানে দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়। প্রথমত, যদি আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকেন এবং তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে থাকে, তাহলে সেই বিচ্ছিন্নতার ফলে পরিবার কী ধরনের কষ্টের সম্মুখীন হবে তা মূল্যায়ন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি আবেদনকারী পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হন বা অসুস্থ সদস্যের যত্ন নেন, তাহলে তার অনুপস্থিতি গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। দ্বিতীয়ত যদি পরিবারের সদস্যরা আবেদনকারীর সঙ্গে বিদেশে চলে যান, তাহলে সেখানে তাদের জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক অবস্থান কীভাবে প্রভাবিত হবে তা বিবেচনা করা হয়।

যদিও এ নতুন নির্দেশিকা কিছুটা স্পষ্টতা এনেছে, তবুও বাস্তবে এ মানদণ্ড পূরণ করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ প্রতিটি কেস আলাদা এবং সিদ্ধান্ত অনেকাংশেই নির্ভর করে প্রমাণ ও পরিস্থিতির ওপর। ফলে আবেদনকারীদের মধ্যে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বর্তমান বাস্তবতায়, যারা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছেন, তাদের জন্য সঠিক আইনি পরামর্শ নেওয়া এবং প্রতিটি ধাপ সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত তাদের ভবিষ্যৎকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিতে পারে। তাই সচেতনতা, সঠিক তথ্য এবং আইনি সহায়তাই হতে পারে এ জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রধান উপায়।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)