বিমানবন্দরে আইস মোতায়েন : যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 25-03-2026

বিমানবন্দরে আইস মোতায়েন : যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক

দীর্ঘস্থায়ী-আংশিক সরকারি শাটডাউনের কারণে ট্রান্সপোর্টেশন সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (টিএসএ)-এর হাজার হাজার কর্মী বেতন না পেয়ে কাজে অনুপস্থিত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় বিমানবন্দরে সিকিউরিটি লাইনে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। গত ২৩ মার্চ সোমবার থেকে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) এজেন্ট মোতায়েন করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যস্ত বিমানবন্দরে আইস ও ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)-এর সশস্ত্র এজেন্টদের মোতায়েন নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। দীর্ঘ লাইনের সমস্যায় বিমানবন্দরগুলো কার্যত অচলাবস্থার মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন টিএসএ কর্মীদের সহায়তায় আইস এজেন্টদের মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সমালোচকরা অভিযোগ করছেন, এরা বিমানবন্দর নিরাপত্তার জন্য প্রশিক্ষিত নয় এবং তাদের উপস্থিতি যাত্রীদের মধ্যে অযথা ভীতি তৈরি করছে। ইতিমধ্যে একজনকে গ্রেফতার করে ডিটেনশন সেন্টারে নেয়া হয়েছে।

১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া শাটডাউনের ফলে টিএসএ কর্মীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে বেতন পাচ্ছেন না। এর ফলে অনেক কর্মী কাজ থেকে বিরত থাকছেন বা চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। শুধু ২২ মার্চ রবিবারই প্রায় ৩,৪০০-এর বেশি টিএসএ কর্মী কাজে অনুপস্থিত ছিলেন, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে যাত্রীদের ওপর। অনেক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা লাইনে অপেক্ষার সময় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত গড়িয়েছে, বিশেষ করে আটলান্টা ও হিউস্টনের মতো ব্যস্ত বিমানবন্দরে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। ফলে কিছু যাত্রী, বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশু নিয়ে ভ্রমণকারীরা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। ফোর্ট লডারডেলের এক যাত্রী জানান, আমাদের কাছে মাত্র ২০ মিনিটের ফ্লাইটের সময় ছিল, কিন্তু নিরাপত্তা চেকপয়েন্ট পার হতে প্রায় তিন ঘণ্টা লাগল। মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক এবং হতাশা প্রকাশ পেতেই পারে।

এই সংকট মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৪টি বড় বিমানবন্দরে শত শত আইস এজেন্ট মোতায়েন করেছে। নিউ ইয়র্ক, আটলান্টা ও হিউস্টনসহ বিভিন্ন শহরের বিমানবন্দরে তাদের দেখা গেছে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইস এজেন্টরা মূল নিরাপত্তা স্ক্রিনিংয়ের কাজ করছেন না। তারা মূলত ভিড় নিয়ন্ত্রণ, লাইন ব্যবস্থাপনা এবং সহায়ক কাজ করছেন, যাতে টিএসএ কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চেকিংয়ে মনোযোগ দিতে পারেন। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, আইসিই এজেন্টরা বিমানবন্দর নিরাপত্তার জন্য প্রশিক্ষিত নন, ফলে এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। এছাড়া, যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ও অস্বস্তিও তৈরি হচ্ছে, কারণ আইসিই সাধারণত অভিবাসন আইন প্রয়োগের সঙ্গে জড়িত একটি সংস্থা।

২৩ মার্চ সোমবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বড় বিমানবন্দরে আইসিই ও ডিএইচএস কর্মকর্তাদের উপস্থিতি চোখে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হার্টসফিল্ড জ্যাকসন আটলান্টা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, ও’হেয়ার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং জন এফ. কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিটি বিমানবন্দরে প্রতি শিফটে অন্তত ৫০ জন আইসিই কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে তারা টিএসএ-এর মূল কাজ যেমন এক্সরে স্ক্যানিং বা মেটাল ডিটেক্টর পরিচালনা করছেন না। বরং তারা প্রবেশ ও প্রস্থান পথ নিয়ন্ত্রণ, ভিড় ব্যবস্থাপনা এবং লাইনের শৃঙ্খলা বজায় রাখার মতো সহায়ক দায়িত্ব পালন করছেন।

শিকাগোর ও’হেয়ার বিমানবন্দরের টার্মিনাল ৩-এ নিরাপত্তা জোন ও সাধারণ টার্মিনালের সংযোগস্থলে সশস্ত্র ডিএইচএস কর্মকর্তাদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইস এজেন্টরা যাত্রীদের পরিচয়পত্র যাচাই করছেন না; তারা কেবল নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছেন। তবুও যাত্রীদের মধ্যে এই উপস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু যাত্রী মনে করছেন, দীর্ঘ লাইনের সমস্যা দ্রুত সমাধানে এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, আবার অনেকে মনে করছেন, সশস্ত্র এজেন্টদের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলছে।

বর্তমান সংকটের মূল কারণ হলো দীর্ঘায়িত সরকারি শাটডাউন, যা ডিএইচএসের অর্থায়ন সংকটের ফলে তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে বসন্তকালীন ছুটির ভ্রমণ চাপও যুক্ত হয়েছে। ফলে বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের ভিড় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। টিএসএ কর্মীদের অনুপস্থিতির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কিছু বিমানবন্দরে এই হার ৪০ শতাংশেরও বেশি। যেমন নিউ অরলিন্সের লুইস আর্মস্ট্রং বিমানবন্দরে অনুপস্থিতির হার ৪২.৩ শতাংশ, আটলান্টায় ৪১.৫ শতাংশ এবং নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে ৩৭.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে অনেক যাত্রীকে নিরাপত্তা চেকপয়েন্ট পার হতে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, আইসিই এজেন্টদের মোতায়েন একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, আইস এই কাজ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালোভাবে করতে পারবে। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রয়োজনে তিনি ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করতেও দ্বিধা করবেন না। একইসঙ্গে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনের সময় আইসিই কর্মকর্তারা যেন মুখোশ না পরেন, যদিও অভিবাসন অভিযানে তিনি তাদের মুখোশ ব্যবহারের পক্ষে। হোয়াইট হাউসের সীমান্ত বিষয়ক উপদেষ্টা টম হোমান জানিয়েছেন, যেসব বিমানবন্দরে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় সবচেয়ে বেশি, সেখানেই প্রথমে আইসিই এজেন্টদের পাঠানো হচ্ছে। তার মতে, আইসিই কর্মকর্তারা ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও লাইনের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশিক্ষিত, যা বর্তমান সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিই কর্মকর্তাদের মূল প্রশিক্ষণ অভিবাসন আইন প্রয়োগ ও গ্রেপ্তার কার্যক্রমে কেন্দ্রীভূত। বিমানবন্দর নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল ও যাত্রীসেবামূলক কাজের জন্য তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। ফলে এই সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে কিছুটা সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নেতিবাচক হতে পারে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরগুলোতে কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) ও বর্ডার প্যাট্রোলের উপস্থিতি নতুন নয়। তারা আন্তর্জাতিক যাত্রী ও কার্গো স্ক্রিনিংয়ের দায়িত্ব পালন করে থাকে। তবে অভ্যন্তরীণ যাত্রী চলাচলের এলাকায় আইসিই-এর এই ধরনের মোতায়েন বিরল এবং বিতর্কিত। বর্তমানে অন্তত ১৩টি বিমানবন্দরে আইসিই এজেন্টদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লাগার্ডিয়া এয়ারপোর্ট, নিউয়ার্ক লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, ফিলাডেলফিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, ফিনিক্স স্কাই হারবার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং পিটসবার্গ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরগুলোতে আইসিই মোতায়েনের এই সিদ্ধান্ত একটি জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন-একদিকে কর্মী সংকট ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা নির্ভর করছে কংগ্রেসে রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)