বিএনপি জোট সরকারের নতুন টার্মে প্রথম মাস


সালেক সুফী , আপডেট করা হয়েছে : 25-03-2026

বিএনপি জোট সরকারের নতুন টার্মে প্রথম মাস

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে এক মাস অতিবাহিত করলো বিএনপি জোট। সংঘাতপূর্ণ বৈষয়িক পরিস্থিতি, জুলাই-আগস্ট ২০২৪ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তী ১৮ মাসের মব সন্ত্রাসে কারণে সৃষ্ট নাজুক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের জন্য প্রথম মাস নিজেদের নানা চ্যালেঞ্জ মূল্যায়ন করে গুছিয়ে নেওয়ার সময়। বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল, যাদের দেশ শাসনের ব্যাপক অভিজ্ঞতা আছে। ১৭ বছর প্রবাসে নির্বাসনে থাকা দলের চেয়ারম্যান দেশে ফিরে সংবর্ধনায় ঘোষণা করেছিলেন-‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’। ঠিক একই ঘোষণা দিয়েছিল মার্টিন যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তি কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং। তিনি বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’। বিএনপি অবশ্য অনেক আগেই দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক আর অর্থনৈতিক উন্নয়নে ৩১ দফা প্রণয়ন করে ব্যাপকভাবে প্রচার করে। অনেকটা ৩১ দফার ভিত্তিতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রণয়ন করে জনগণের কাছে তুলে ধরে। প্রথম মাসে সরকার সে প্রতিশ্রুতির বেশকিছু বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে। স্মরণে রাখতে হবে, নির্বাচনের পটভূমিতে অন্তর্বর্তী সরকার দেশে রাজীনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইন বিচারব্যবস্থা, এমনকি সংবিধান সংস্কার বিষয়ে আওয়ামী লীগ ব্যতীত অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করে। দেশের সংবিধানের অধীনে শপথ নেওয়া একটি সরকার সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু জুলাই সনদ নামে প্রণয়ন করতে পারে কি না বা সেটি অনুমোদন প্রক্রিয়ায় গণভোটের আয়োজন করতে পারে কি না, সেটি নিয়ে ব্যাপক আইনগত বিচার বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অধিকন্তু কিছু বিষয়ে বিএনপি এবং সমমনা দলগুলোর নোট অব ডিসেন্ট আছে। যাক, এ বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে সার্বভৌম সংসদে আলোচিত হবে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে জারি হওয়া ১৩৩ অর্ডিন্যান্স বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। একটি পার্লামেন্টারি কমিটি হয়েছে এগুলো বিবেচনা করে সুপারিশসহ সংসদে আলোচনার জন্য উপস্থাপন করতে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারি দল এবং শক্তিশালী বিরোধী দল পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। সংসদে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না হওয়া ব্যতিরেকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু আইনগত অনুমোদন পাবে না। পার্লামেন্টের আগামী অধিবেশনগুলো প্রাণবন্ত হবে সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ শক্তির সঙ্গে ইরানের সামরিক সংঘর্ষ বিশ্বব্যাপী মারাত্মক অর্থনৈতিক, জ্বালানি এবং সর্বোপরি নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করেছে। আগুনের উত্তাপ ভালো মতোই আঁচ করছে বাংলাদেশ।

আপাতত নতুন সরকার গৃহীত পদক্ষেপসমূহ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি। সরকারের কিছু পদক্ষেপ নন্দিত হয়েছে, কিছু বিতর্কিত সমালোচিত হয়েছে, কিছু হয়েছে নিন্দিত। নতুন সরকার নিজেদের মত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন সাজাবে সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে দলদাস বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদায়ন করলে সংগত কারণেই সিদ্ধান্ত নিন্দিত হবে।

যেসব সিদ্ধান্ত নন্দিত হয়েছে সেগুলো হলো-ফ্যামিলি কার্ড, ধর্মীয় লোকদের সম্মানি ভাতা, খাল খনন, শুল্কমুক্ত গাড়ি এবং সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, ভিআইপি প্রটোকল সীমিতকরণ, কৃষিঋণ মওকুফ, বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা হ্রাস, ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ, পরিত্যক্ত ভবনে চিকিৎসাকেন্দ্র। উপরোক্ত অনেকগুলো বিষয় বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারে ছিল। ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড কার্যক্রম সঠিকভাবে মনিটরিং হলে অবশ্যই শুভ প্রভাব সৃষ্টি করবে। কৃষিঋণ মওকুফ, খাল খনন কার্যক্রম যদি নিবিড় তদারকির মাধ্যমে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান সৃষ্টি করবে। আশা করি, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপি সরকার শিক্ষা নিয়েছে। দেশের তরুণ সমাজকে এসব কাজে স্বেচ্ছাশ্রম প্রদানে উদ্বুদ্ধ করা গেলে সমাজে জাগরণ সৃষ্টি হবে।

এবার আসি প্রশাসনে নিয়োগ বদলি প্রসঙ্গে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বেশকিছু অবসরগ্রহণকারী আমলাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিল। সরকার অধিকাংশ চুক্তি বাতিল করে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দল ঘনিষ্ঠ কিছু কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক সরকার কম বেশি এটি করবেই। সামরিক বাহিনীতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন সরকারের স্থায়িত্বের জন্য জরুরি বলে মনে করি। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন সংস্থার অযোগ্য নেতৃত্ব পরিবর্তন যথাযথ মনে হয়েছে। কিছু পরিবর্তন হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রাইম ট্যাইব্যুনালে। কিন্তু পক্ষপাতদুষ্ট ট্রাইব্যুনালটি সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন বলে মনে করি।

যৌক্তিক সমালোচনা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন করে একজন কথিত ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীকে পদায়ন করায়। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ভিসিদের ঢালাওভাবে পরিবর্তন করে বিএনপি ঘনিষ্ঠ শিক্ষাবিদদের পদায়ন সমালোচনার মুখে পড়েছে। সিটি করপোরেশন এবং মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনগুলোতেও দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। উচিত হবে পার্লামেন্টে থাকা বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলাপ করে নির্বাচন কমিশন নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পুনর্গঠন করে অবিলম্বে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান।

সর্বোপরি প্রধান সংকট এখন জ্বালানি বিদ্যুৎ। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ এখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য প্রসারিত হয়ে সারা বিশ্বে জ্বালানি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা সংকটের সৃষ্টি করছে। প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি জ্বালানি এবং বিদ্যুৎনির্ভর বাংলাদেশ জ্বালানির অগ্নিমূল্য এবং ব্যাহত সাপ্লাই চেন সামাল দিতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। অনভিজ্ঞ মন্ত্রীরা বেসামাল কথা না বলে পেশাদারদের সমন্বিত করে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কৃচ্ছ্রতা পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা বর্তমান অবস্থা আর দুই সপ্তাহ চললে বাংলাদেশের জ্বালানি এবং এলএলজি আমদানি প্রায় শূন্যের পর্যায়ে নেমে যেতে পারে। প্রয়োজন সর্বোচ্চ দক্ষতার জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং আগ্রাসী জ্বালানি কূটনীতি। বাংলাদেশে কিন্তু আসন্ন গ্রীষ্মকালে ৬-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হবে। সারের অভাবে কৃষি সংকটে পড়বে, আমদানি রফতানি ব্যাহত হবে।

আশা করি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ উপদেশ দিয়ে কঠিন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)