জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কে সঙ্গে রাখতে চায় বিএনপি। তবে ক্ষমতার অংশীদার হিসাবে নয় সংসদের ভেতরে বাইরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। তবে কারো কারো মতে, জামায়াতে ইসলামী থেকে দূরে রাখতে বিএনপি এই কৌশল নিয়েছে। অন্যদিকে এনসিপির-ও একটি বড়ো অংশও চায় তারা তাদের দলকে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির সাথে সর্ম্পক্ত রাখতে। এসব তথ্য পাওয়া গেছে বিএনপি ও এনসিপির ঘনিষ্ট সুত্র থেকে।
এনসিপির প্রশংসায় যখন সালাউদ্দিন আহমেদ
সম্প্রতি রাজধানীর ধানমন্ডিতে আবাহনী মাঠে জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ এনসিপিকে নিয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন যা বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় সংসদে এনসিপির ছয়টি আসন পাওয়া দলটির জন্য বড় অর্জন। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা বাড়তে বাড়তে তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহণ করবে বলেও তাদেরকে আশারবাণী শুনিয়েছেন। সালাউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, আমরা এখন রাজনীতি করব বর্তমানের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য। এই ভবিষ্যতে নির্মাণের জন্য এনসিপির রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়াকে আমাদের জন্য রাজনৈতিক বিজয় বলে মনে করি।’
ছাত্রদলের নেতাকে বহিষ্কারের বার্তা কি?
এদিকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শাখার এক নেতাকে বহিষ্কার করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। শাহরিয়ার উদ্দিন ফাহাদ নামে এই নেতা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ছাত্রদলের এক বিবৃতিতে এ বহিষ্কার আদেশ দেওয়া হয়। জানা গেছে শাহরিয়ার উদ্দিন ফাহাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। ফেসবুকে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি বলেন, দলমত যা ই হোক, এইটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, দেবিদ্বারের ছেলেরা এখন হাসনাত হতে চায় উল্লেখ করে পোস্ট দেয়। এধরনের একটি পোস্টেই ছাত্রদলের শীর্ষ থেকে এমন দ্রুত প্রতিক্রিয়াকে অনেকে ইঙ্গিতপূর্ণ বলে মনে করেন।
বিএনপির স্পষ্টতা পরিস্কার করা হলো
এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে বিএনপির স্পষ্টতা পরিস্কার করা হলো। সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা বেশ জমে উঠে। তা হলো গণঅভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার তদন্ত প্রসঙ্গটি। সম্প্রতি গত ২৭ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণঅভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার তদন্তের বিষয়ে নিয়ে কিছ কথা বলেন। তার বক্তব্য নিয়ে জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়াদের নিয়ে গড়া এনসিপির নেতারা বেশ ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া দেখান। পরে অবশ্য মীর্জা ফকরুল জানিয়ে দেন যে,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেটি বলেছেন, সেটিই হবে। তদন্ত হয়েছে, প্রয়োজন হলে আবারও তদন্ত হবে। বিষয়গুলো যেহেতু আদালতে আছে, আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলবে। এদিকে একটি গণমাধ্যমে খবর দেয় যে, জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারনামা মেনে চলবে বিএনপি সরকার। গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের চালানো হত্যাযজ্ঞ প্রতিরোধে ছাত্র-জনতার কৃতকর্মের বিচার হবে না। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কেউ প্রতিতরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলেও অভ্যুত্থানকারীদের জন্য দায়মুক্তি অব্যাহত থাকবে। এর আগে জুলাই অভ্যুত্থান সময়ের হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার শুক্রবার বিবৃতিতে বলেছেন, হত্যায় জড়িতরা জামিনে মুক্ত হয়ে সহিংসতায় জড়ালে দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। তা-ই এনিয়ে বিএনপির বর্তমান অবস্থানও ইঙ্গিত দিচ্ছে তারা ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির সাথে কোনো বিষয়ে দুরুত্ব রাখতে চায় না। বিশেষ করে জুলাই জাতীয় সনদের ব্যাপারে এনসিপিরও একটা সন্দেহ ছিল যা এখন কেটে যাচ্ছে বলে কারো কারো অভিমত।
এনসিপিতেও জামায়াত নিয়ে কথা উঠেছে
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আর কত দিন থাকবে, এই প্রশ্ন উঠেছে দলটির সাধারণ সভায়। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায় এই প্রশ্নের জবাবে পরিষ্কার কোনো উত্তর দেননি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন। রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সাধারণ সভায় এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব নাহিদা সারোয়ার (নিভা) শুক্রবারের সাধারণ সভায় বেশ সোচ্চার ছিলেন। তাঁরাসহ কয়েকজন দলের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। একপর্যায়ে সামান্তা প্রশ্ন করেন, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী ঐক্য আর কত দিন থাকবে? সবায় এমন অভিযোগও উঠে আসে যে, ১১-দলীয় ঐক্যে এনসিপির যে ৩০ জন প্রার্থী ছিলেন, তাঁদের সবাইকে জামায়াত সমানভাবে সহযোগিতা করেনি। অথচ জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্যে যাওয়াকে কেন্দ্র করে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে এনসিপি থেকে অন্তত ১৭ জন নেতা পদত্যাগ করেছিলেন। পদত্যাগী নেতাদের ফেরাতে কোনো উদ্যোগও নেই এখন।
বিএনপি যে কারণে এনসিপিকে কাছে টানছে
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর সাথে নির্বাচনী জোট বাধে এনসিপি। ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি কে সমর্থন দিয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে দেখতে চেয়েছিল বিএনপি। কিন্তু এনসিপি বিএনপি ওই প্রক্রিয়া না গিয়ে জামায়াতের সাথে দলটি জোট বাধে। কারো কারো মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ক্ষমতায় আসীন হবে এমন বড়ো ধরণের আশার বাণী শুনিয়ে এনসিপিকে তাদের ঝুড়িতে দলটিকে। আরেক সূত্র জানায় জামায়াত অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে গোপন যোগাযোগ রেখে প্রশাসন এমনকি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন বাদ দিয়ে জামায়াত একটি জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলে সময় ক্ষেপন করেছিল বলে বিএনপির ধারণা। এছাড়া জামায়াতের সাথে অতীতে দীর্ঘমেয়াদী সখ্যতার কারণে বিএনপি দেশে বিদেশে বেশ কোনঠাসা ছিল। এখন জামায়াতের সাথে এনসিপির সখ্যতায় বিএনপি অন্য হিসাব কষছে। তা-ই জামায়াত থেকে এনসিপিকে দূরে রেখে কাছে টানতে চায় বিএনপিকে উচিৎ শিক্ষার নামে। এতে বিএনপি মনে করে জামায়াত সেক্ষেত্রে আদর্শগতভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোনঠাসা থাকবে। অন্যদিকে এনসিপির অনেক নেতাও এখন মনে করেন, জামায়াতের সাথে এনসিপির জোটে অংশ নেওয়ায় তারুণ্যের রাজনীতির কবর রচিত হয়ে গেছে। তাদের মতে, সারাদেশে মানুষের, নেতাকর্মীদের আশা-আকাংখাকে জলাঞ্জলি দিয়ে গুটিকয়েক নেতার স্বার্থ হাসিল করতেই এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। অবশ্য জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার কারণে এনসিপির অর্ধশত নেতা দলটির আহবায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জামায়াতের এনসিপিসহ মোট ১০ দলের জোটের পর দল থেকে যুগ্ম আহবায়ক তাজনূভা জাবীনসহ অন্তত চারজন নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন কয়েকজন। অন্যদিকে দলটির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা তাসনিম জারাও দল থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও সামান্তা শারমিনও। তা-ই নির্বাচনের পরে কারো কারো মতে, জামায়াতের সাথে এনসিপির আগের সম্পর্ক আর নেই। অন্যদিকে এনসিপির ভেতরেও ভেতরে ইচ্ছা তারা নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ না করে দলকে সাসনের দিকে নিয়ে যেতে প্রায় অসাধ্য। তা-ই তারাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন বিএনপি’র সাথে কাজ করার। তবে সংশ্লিস্ট সুত্র জানায় জামায়াত থেকে এনসিপির দূরুত্ব তৈরি রমজানের পরে আরও দৃশ্যমান হবে।