দেশের এক ক্রান্তি লগ্নে স্বাধীনতা প্রিয় জনগণের বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করেছে তারেক জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জোট সরকার। নির্বাচন নিয়ে কিছু ত্রুটি বিচ্ছুতি, কিছু আপোষ, কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং হলেও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে আসা সরকারের কাছে জনগণের বিপুল প্রত্যাশা যে অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত মৌলিক বিষয়সমূহে সংস্কার সাধন করে জন স্বার্থ সংরক্ষণ করবে। দেশে সকল মত পথের শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থানের জন্য আইনের শাসন স্থাপন সবচেয়ে জরুরি। সরকারকে আইনগতভাবেই সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সকল রাজনৈতিক দলকে সুস্থ রাজনীতি করার সুযোগ দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংহর কারণে বিনা বিচারে দীর্ঘ দিন কারাগারে আটক রাজনীতিবিদ, ব্যাবসায়ী, সাংবাদিক, শিল্পী, লেখক, বুদ্ধিজীবীদের মুক্তি দিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ দিতে হবে।
সরকার ইতিমধ্যে সামরিক এবং বেসামরিক পর্যায়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর পদে পরিবর্তন এনেছে। রাজনৈতিক সরকার তাদের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গুরুত্বপূর্ণ পদে আস্থাশীল ব্যাক্তিদের আসীন করবে সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনের আগে আরো বিস্তারিত যাচাই বাছাই করা উচিৎ।
বিগত সরকারসমূহের সময়ে নানা ক্ষেত্রে সাফল্য আর ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ অতিরিক্ত আমলা নির্ভরতা। আমলাতন্ত্র বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঔপনিবেশিক অভিশাপ। সুবিধাবাদী আমলারা অধিকাংশ সময়ে ভুল পরামর্শ দিয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করে ফায়েদা লুটে থাকে। জনগণকে সেবার পরিবর্তে অপশাসনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নকে ব্যাহত করে। নতুন সরকারকে তাদের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিতভাবে প্রশাসনিক সংস্কার করতে হবে। দেখলাম সরকার সঠিকভাবেই সচিব পর্যায়ে রদবদল শুরু করেছে। তবে মনে দলকানা প্রশাসন কিন্তু দেশ বা দলের জন্য শুভ ফল বয়ে আনে না। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন সচিবালয় অশুভ সিন্ডিকেটের চারণ ভূমিতে পরিণত না হয়। দেখে ভালো লাগছে প্রধানমন্ত্রী নিজে সংযমী ভূমিকা পালন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেষ্টা করছেন।
সরকারকে দ্রুত বাজার ব্যাবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি স্থাপন করে দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরতে হবে। দেশে বিভিন্ন কৃষিপণ্যের যথেষ্ট উৎপাদন হচ্ছে। প্রয়োজনীয় আমদানি হচ্ছে। এখন সরবরাহ চেনে অশুভ সিন্ডিকেটের প্রভাব থাকায় বাজার অস্থির আছে। বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকলে জনগণ স্বস্তি পাবে। এই ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি এবং দখল দারিত্বতের বিষয়ে আপোষহীন থাকতে হবে। ভোক্তা অধিকারকে পূর্ণাঙ্গ সমর্থন দিতে হবে। কৃষিপণ্যের সাপ্লাই চেন স্বাভাবিক রাখতে টেলিমার্কেটিং চালু হয়ে কৃষক এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা হবে।
আমি দেশের শিক্ষা ব্যাবস্থাকে গণমুখী এবং সৃজনশীল করার জন্য শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি এবং দলবাজি দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাত্ত্বিক বিষয়াদির পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান সমন্বিত ব্যাবহারিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। শিশু কিশোরদের দেশের গৌরব স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন বিষয়ে সঠিক বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান দানের জন্য কার্যক্রমে লাগসই পরবিবর্তন আনতে হবে। পরিবেশ সচেতনতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা শিশু বয়স থেকেই গড়ে তুলতে হবে। আমি সরকারকে অনুরোধ করবো ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কার্যক্রম সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে। শিক্ষাকে পণ্য না বানিয়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টির উপকরণ করতে হবে। দেখলাম নতুন শিক্ষামন্ত্রী ইতিমধ্যেই কিছু বাস্তব ধর্মী উদ্যোগ নিতে শুরু করেছেন। শিক্ষার পর আসবে নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো। দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে দুর্নীতি আর অব্যাবস্থাপনার কারণে দেশের মানুষ স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। বেসরকারি কিছু হাসপাতালে উন্নত স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ জনগণের জন্য ব্যয়বহুল। বিপুল জনগণ প্রতিবেশী দেশে বাধ্য হয়ে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। অবিলম্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা সরকারি হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে বন্ধু দেশগুলোর সহায়তায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিষেশায়িত হাসপাতাল গড়ে তুলতে হবে। কম্যুনিটি ক্লিনিকগুলোতে যথাযথ স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
অবাধ দুর্নীতি আর সিন্ডিকেটগুলোর আগ্রাসনে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে গভীর সংকট সৃষ্টি হয়েছে। অনিশ্চিত জ্বালানি বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকটে শিল্প কারখানাগুলো একের পর বন্ধ হয়ে বেকার সমস্যা প্রকট হচ্ছে। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্যেও অশুভ প্রভাব পড়ছে। বিএনপি সরকার অতীতে ১৯৯১-৯৬ , ২০০১-২০০৬ সালে কিছু ভ্রান্ত কৌশলের কারণে জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরে কাঙ্খিত সাফল্য লাভ করতে পারে নি। বাংলাদেশের জনগণের ১৯৯৬-৯৭, ২০০৮ -২০১০ তীব্র জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটের কথা স্মরণে আছে। আশা করি এবার তারেক জিয়ার সরকার এই সেক্টর নিয়ে প্রয়োজনীয় হোমওয়ার্ক করেছে। অর্থনীতির চালিকা শক্তি জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরের ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন আছে। দেশের জ্বালানি সম্পদ বিশেষত কয়লা এবং গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন জোরদার করতে হবে, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাধিকার দিতে হবে, আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত কাযক্রম গ্রহণের জন্য যথাযথ পেশাদারদের প্রণোদনা দিয়ে যথাস্থানে দায়িত্ব দিতে হবে।
পরিবেশ সংরক্ষণ সরকারের অন্যতম প্রাধিকার হতে হবে। বাংলাদেশের জনগণ চায় না ঢাকা শহর বসবাসের জন্য দুনিয়ার দূষিততম শহরের কালিমায় থাকুক। ভালো লক্ষণ সরকার নদী খাল বিল দখল মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এগুলো যেন শুধু বরাবরের মত স্লোগানে সীমিত না থাকে নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ বিশেষত তরুণ সমাজকে সব কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রাখতে হবে।
সরকারের কার্যক্রম কিন্তু ১৮০ দিন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে জনগণ। পার্লিয়ামেন্টে কিন্তু বিপরীত ভাবধারার শক্তিশালী বিরোধী দল আছে। সরকারের পা পিছলানোর কিন্তু অবকাশ নেই। ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার জনপ্রত্যাশা পূরণে সফল হবে বলে বিশ্বাস করি। বিএনপি সরকারকে পরামর্শ দিবো তাদের ব্যার্থতা কিন্তু ঈগল দৃষ্টি দিয়ে দেখবে সুযোগ সন্ধানি গোষ্ঠী। তাই বিচ্যুতির কোন সুযোগ নেই।