ওয়ারেন্ট ছাড়া বাড়িতে প্রবেশের গোপন নীতি আইসের


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 04-02-2026

ওয়ারেন্ট ছাড়া বাড়িতে প্রবেশের গোপন নীতি আইসের

ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর আদালত কর্তৃক জারিকৃত পরোয়ানা ছাড়া নতিহীন অভিবাসীদের আমেরিকানদের বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশের একটি গোপন নীতি সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে গভীর উদ্বেগ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দুইজন হুইসেলব্লোয়ার জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের মে মাসে জারি করা একটি গোপন মেমোর মাধ্যমে আইস নির্দিষ্ট কিছু অ-নাগরিকের বাড়িতে বিচারিক ওয়ারেন্ট ছাড়াই জোরপূর্বক প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। নতুন এই নীতির আওতায় আইস এখন দাবি করছে যে শুধু একটি প্রশাসনিক ওয়ারেন্ট ফর্ম আই-২০৫ ব্যবহার করেই তারা কোনো বাড়িতে প্রবেশ করতে পারে। এই বিধান সংস্থাটির কয়েক দশকের পুরোনো নীতি, চর্চা এবং বর্তমান লিখিত প্রশিক্ষণ নির্দেশিকার সঙ্গেও সরাসরি সাংঘর্ষিক।

এই আচরণবিধি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মূল চেতনাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। চতুর্থ সংশোধনী অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া কোনো ব্যক্তির বাড়িতে প্রবেশের জন্য অবশ্যই একজন নিরপেক্ষ ও ইনডেপেনডেন্ট বিচারকের জারি করা ওয়ারেন্ট প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্ট বহু আগেই স্পষ্ট করেছে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের সিদ্ধান্তে কারো বাড়িতে প্রবেশ করতে পারলে জনগণের ঘরবাড়ির নিরাপত্তা পুরোপুরি পুলিশের বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং সংবিধান কার্যত অর্থহীন হয়ে যাবে। আইনের দৃষ্টিতে অ-নাগরিকরাও এই সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় পড়েন।

প্রশাসনিক ওয়ারেন্ট বিচারিক ওয়ারেন্টের মতো ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনো কর্তৃপক্ষ দ্বারা পর্যালোচিত হয় না। আইস -এর নিজস্ব মেমোতেই উল্লেখ রয়েছে যে, যেকোনো তদারকি কর্মকর্তা ফর্ম আই ২০৫-এ স্বাক্ষর করতে পারেন। এমনকি যেসব ক্ষেত্রে বহিষ্কারের আদেশ থাকে, সেগুলোও নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, বরং নির্বাহী শাখার অধীন ইমিগ্রেশন বিচারকদের দ্বারা জারি হয়। এসব বিচারক এবং প্রসিকিউটর উভয়ই নির্বাহী বিভাগের অধীন হওয়ায় এখানে ক্ষমতার বিভাজন অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে শিশু বা শুনানিতে অনুপস্থিত থাকা ব্যক্তিরাও বহিষ্কারের আদেশের শিকার হন, এমনকি তারা তা জানতেও পারেন না। আরো উদ্বেগজনক হলো, গোপন মেমোতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে এই নীতি ভবিষ্যতে সব অনাগরিকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে, শুধু যাদের বহিষ্কার আদেশ রয়েছে তাদের জন্য নয়।

হুইসেলব্লোয়ারদের অভিযোগ অনুযায়ী, আইস ইচ্ছাকৃতভাবেই এই নীতি গোপন রেখেছে। সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা মেমোর কোনো লিখিত কপি বিতরণ করেননি, এমনকি সংস্থার ভেতরেও নয়। পরিবর্তে মৌখিক নির্দেশনার মাধ্যমে এজেন্টদের জানানো হয়েছে এবং লিখিত প্রশিক্ষণ সামগ্রী হালনাগাদ করা হয়নি। পাশাপাশি, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অফিস অব লিগ্যাল কাউন্সেলের আরেকটি আইনি মেমো এখনো গোপন রয়েছে, যা তথ্য অধিকার আইনের আওতায় প্রকাশ এড়ানোর প্রচেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে স্পষ্ট হয় যে আইস ইচ্ছাকৃতভাবে একটি কাগজবিহীন নীতি বজায় রাখতে চেয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে না হয়।

যদিও আইস এজেন্টদের বিরুদ্ধে অসাংবিধানিক আচরণের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় করা কঠিন এবং অভিবাসন মামলায় অবৈধভাবে সংগৃহীত প্রমাণ অনেক সময় গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়, তবুও অতীতের বহু মামলার মতো এ নীতির বিরুদ্ধেও আইনি লড়াইয়ের পথ খোলা রয়েছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। আইস নিজেই যেভাবে নীতিটি গোপন রেখেছে, তাতে বোঝা যায় সংস্থাটি এর আইনি দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন। ফেডারেল আদালতে কবে এবং কীভাবে এই নীতির সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষা হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

মেমো জারির পর গত আট মাসে কতবার শুধু প্রশাসনিক ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে আইস মানুষের বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করেছে, সে বিষয়ে কোনো সরকারি তথ্য নেই। তবে সম্প্রতি মিনিয়াপোলিসে চংলি স্কট থাও নামের এক বয়স্ক মার্কিন নাগরিক অভিযোগ করেছেন, আইস এজেন্টরা অস্ত্র তাক করে তার বাড়িতে ঢুকে তাকে আটক করেন এবং কোনো ওয়ারেন্ট প্রদর্শন করেননি। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই ঘটনা আইসের ভুল ও অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের একটি ভয়াবহ উদাহরণ।

ইমিগ্রেশন অধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলছেন, এই গোপন নীতি শুধু অনাগরিকদের জন্য নয়, তাদের সঙ্গে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিক শিশু, জীবনসঙ্গী, অভিভাবক ও প্রতিবেশীদের জন্যও মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। মিনিয়াপোলিস, পোর্টল্যান্ড, নিউ অরলিন্স, শিকাগো, ওয়াশিংটন ডিসি, শার্লট ও লস অ্যাঞ্জেলেসসহ একাধিক শহরে আইস -এর আগ্রাসী অভিযান ইতোমধ্যেই জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, নতুন এই মেমো সেই সহিংসতাকে মানুষের ঘরের ভেতর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা কেবল অনাগরিক নয়, সমগ্র আমেরিকান সমাজের নাগরিক স্বাধীনতাকেই হুমকির মুখে ফেলছে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)