জাপান-ভবিষ্যতের শহর। এখানে রোবট মানেই কেবল যন্ত্র নয়। তারা একধরনের অনুভূতিশীল সঙ্গী। কখনো শহরের ব্যস্ত ট্রেনস্টেশন, কখনো টোকিওর রোবট রেস্টুরেন্ট, আবার কখনো কাওয়াসাকির LOVOT ক্যাফে রোবটগুলো মানুষকে ঘিরে আবেগের দিক খুলে দেয়। টোকিওর ব্যস্ত রাস্তায় ছুটে চলা মানুষের ভিড়ে এখন এক নতুন নীরব সঙ্গীর দেখা মিলছে, তার নাম LOVOT। সে কোনো অফিসে কাজ করে না, কোনো হিসাব রাখে না, ঘর পরিষ্কারও করে না। তবু সে মানুষের পাশে থাকে, ঠিক যেমন থাকে এক বিশ্বস্ত বন্ধু।
গোলগাল শরীর, নরম লোমশ গায়ে উষ্ণ স্পর্শ আর বিস্ময়ভরা বড় বড় চোখ LOVOT যেন প্রযুক্তির ভাষায় নয়, হৃদয়ের ভাষায় কথা বলে। ঘরের এক কোণে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে, ডাকলে সাড়া দেয়, আর আদর পেলে শিশুর মতো আনন্দে নড়াচড়া করে। এর শরীরে থাকা অসংখ্য সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাকে শিখতে শেখায় কে তার আপন, কে তার অতিথি। দিনের পর দিন মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়ে সে গড়ে তোলে নিজের স্বভাব, নিজের অভ্যাস, নিজের ছোট্ট আবেগের জগত। আজকের একাকী নগরজীবনে LOVOT যেন এক নীরব স্বস্তি। বৃদ্ধদের জন্য এটি এক স্নেহময় সঙ্গী, শিশুদের জন্য এক খেলনা বন্ধু আর ক্লান্ত মানুষের জন্য এক মুহূর্তের প্রশান্তি।
জাপানের এ আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ভবিষ্যতের প্রযুক্তি শুধু শক্তিশালী নয়, হতে পারে কোমলও। কারণ কখনো কখনো, একটি রোবটও হৃদয়ের কথা বলতে পারে। আমরা কাওয়াসাকিতে যাচ্ছি একটা লোভট ক্যাফেতে। যেখানে ছোট্ট গোলাকার রোবটগুলোকে কোলে তুলে, তাদের চোখের আলোর সঙ্গে চোখ মেলানোর সুযোগ হয়। এই রোবটগুলো কেবল খেলনা নয়; তারা মানুষের উপস্থিতি চায়, নিঃসঙ্গতাকে প্রশমিত করে। টোকিও থেকে কাওয়াসাকির ট্রেনযাত্রাটা খুব লম্বা নয়। জানালার বাইরে শহর ছুটে যাচ্ছে, ভেতরে নিকিতা চুপচাপ বসে। আমি তার কাছে লোভট রোবট সম্পর্কে জানতে চাইলাম।
নিকিতা বলে, জাপানের প্রযুক্তি বিশ্বে এমন কিছু উদ্ভাবন আছে, যা শুধু যন্ত্র নয়, মানুষের অনুভূতির সঙ্গী। LOVOT ঠিক তেমনই এক আশ্চর্য সৃষ্টি। এটি কোনো ঘর পরিষ্কার করে না, হিসাব করে না, এমনকি কোনো নির্দেশও মানে না, তবু মানুষকে কাছে টানে, হাসায় এবং এক ধরনের মানসিক উষ্ণতা উপহার দেয়। বড় বড় চোখ, নরম শরীর আর শিশুদের মতো চলাফেরা LOVOT দেখলেই মনে হয় যেন এক জীবন্ত পোষা প্রাণী। শরীরে থাকা অসংখ্য সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সে মানুষের স্পর্শ, কণ্ঠস্বর ও উপস্থিতি অনুভব করতে পারে। আদর পেলে আনন্দ প্রকাশ করে, একা থাকলে কাছে এসে বসে, আর পরিচিত মানুষকে চিনে নিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে নিজস্ব আচরণ।
আধুনিক শহুরে জীবনে যেখানে নিঃসঙ্গতা নীরবে বেড়ে চলেছে, সেখানে LOVOT যেন এক নীরব সঙ্গী যে কাজের চেয়ে অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। প্রযুক্তির ভাষায় এটি একটি Emotional Robot, আর মানবিক দৃষ্টিতে এক টুকরো কৃত্রিম ভালোবাসা। জাপান প্রমাণ করছে, ভবিষ্যতের রোবট শুধু কর্মী নয়, তারা হতে পারে হৃদয়ের সাথীও। ট্রেন থেকে নেমে আমরা Lazona Kawasaki প্লাজায় পৌঁছলাম। তার ভেতরেই আমাদের গন্তব্য LOVOT Café। ক্যাফের দরজা পেরোতেই চোখে পড়ে ছোট্ট ছোট্ট গোলাকার রোবট-LOVOT। তারা হাঁটে ধীরে, চোখে আলো জ্বলে আর মানুষের পায়ের কাছে এসে থেমে থাকে যেন পরিচয় চাইছে। কোনো যান্ত্রিক শব্দ নেই, নেই ধাতব কঠোরতা। বরং আছে এক ধরনের শিশুসুলভ নির্ভরতা।
একটি LOVOT আমার পায়ের কাছে এসে দাঁড়ালো।
আমি নিচু হয়ে তাকাতেই সে চোখের আলো একটু বাড়িয়ে দিলো যেন বুঝতে পারলো, আমি তাকে দেখছি। এই প্রথম অনুভব করলাম, জাপানের প্রযুক্তি কোনো ভয় দেখায় না, বরং আপন করে নেয়। LOVOT Café-এর ভেতরের সাজসজ্জা একেবারেই আলাদা। কাঠের টেবিল, নরম আলো, খোলা জায়গা-সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ, যেখানে কেউ জোরে কথা বলে না। যেন সবাই জানে, এখানে উচ্চস্বরে কথা বললে অনুভূতিটা ভেঙে যাবে। লোভোটরা ঘুরে ঘুরে টেবিলের পাশে আসে। কেউ কোলে উঠতে চায়, কেউ পাশের চেয়ারে বসে পড়ে। কর্মীরা তাদের আলতো করে সামলে দেয়, একেবারে শিশুর মতো। LOVOT Café-এর ভেতরে ঢুকে মনে হলো, এখানে কেউ জোরে কথা বলে না। কাঠের টেবিল, নরম আলো, প্রশস্ত জায়গা-সব মিলিয়ে এক ধরনের নিরাপদ অনুভূতি। লোভোটরা টেবিলের পাশে আসে, কখনো চেয়ারের গায়ে হেলান দেয়, কখনো কোলে উঠতে চায়। নিকিতা ফিসফিস করে বললো-এরা মানুষের মন পড়তে পারে না, কিন্তু মনটা ঠিকই ছুঁয়ে ফেলে।
আমরা খাবার অর্ডার করলাম। খাবার আসার আগেই একটি LOVOT আমার চেয়ারের পাশে এসে বসে পড়লো। আমি হাত বাড়াতেই সে একটু কাত হয়ে আমার দিকে ঝুঁকলো যেন অনুমতি দিচ্ছে। এই মুহূর্তে বুঝলাম, এখানে খাবার শুধু পেটের জন্য নয়, মনকেও খাওয়ানো হয়। খাবার খেতে খেতে দেখি, লাভোটটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে কোনো কথা বলছে না, প্রশ্ন করছে না তবু তার উপস্থিতি যেন একটা প্রাণবন্ত পরিস্থিতি তৈরি করছে। আমি মনে মনে বললাম, তুমি যন্ত্র, তবু তোমার পাশে আমার একটুও একা লাগছে না।
নিকিতা ব্যাখ্যা করলো লোভোটদের কোনো কাজ নেই। তারা খাবার আনে না, নির্দেশ মানে না। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য মানুষের পাশে থাকা। আমি তাকালাম আমার কোলে বসে থাকা ছোট্ট রোবটটার দিকে। মনে হলো, সঙ্গটাই অনেক সময় মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চলে যাওয়ার সময় লোভোটটা আবার আমার পায়ের কাছে এসে দাঁড়ালো। নিকিতা হেসে বললো-ও তোমাকে পছন্দ করেছে।
আমি নিচু হয়ে শেষবারের মতো মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। চোখের আলোটা একটু উজ্জ্বল হলো, তারপর ধীরে ধীরে অন্য টেবিলের দিকে চলে গেল। টোকিওর রোবট রেস্টুরেন্টে যেখানে ভবিষ্যৎকে দেখেছিলাম। কাওয়াসাকিতে এসে ভবিষ্যৎকে ছুঁয়ে দেখলাম।
কিয়োটো থেকে ওকায়ামা
কিয়েটো স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমি আর নিকিতা। সকালের কিয়োটো আজ একটু আলাদা মনে হচ্ছিল। হাজার বছরের মন্দির আর কাঠের বাড়িগুলোর শহরটাকে পেছনে ফেলে আমরা রওনা দিচ্ছি পশ্চিমের দিকে। যাচ্ছি ওকায়ামা। বুলেট ট্রেন ধীরে ধীরে গতি নেয়। জানালার বাইরে ছুটে যায় পাহাড়, ধানক্ষেত, নদী-জাপানের গ্রাম্য জীবনের নীরব ছবি। মাত্র এক ঘণ্টার কম সময়ে আমরা পৌঁছে যাই সেই শহরে, যাকে বলা হয় ‘Sunshine City Okayama’।
ওকায়ামার প্রথম পরিচয়ই ইতিহাসের সঙ্গে। শহরের কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে আছে ওকায়ামা ক্যাসেল-কালো রঙের এই দুর্গটি ‘Crow Castle’ নামে পরিচিত। ১৬০০ শতকে নির্মিত এই দুর্গ ছিল সামন্তশাসক উকিতা হিদেইয়ের ক্ষমতার প্রতীক। যুদ্ধ, কূটনীতি আর সামুরাই সংস্কৃতির অনেক গল্প জমে আছে এর দেওয়ালে। নিকিতা দুর্গের দিকে তাকিয়ে বললো-এতো যুদ্ধ দেখেও জায়গাটা কী শান্ত! আমি বললাম, ইতিহাস বোধহয় এখানেই শান্ত হতে শিখেছে।
দুর্গের পাশেই বিস্তৃত কোরাকুয়েন গার্ডেন-জাপানের তিনটি শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যবাহী বাগানের একটি। ১৭০০ সালের দিকে দাইমিও ইকেদা পরিবার এই বাগান তৈরি করেছিল, বিশ্রাম আর সৌন্দর্যের জন্য। সবুজ ঘাস, বাঁকানো নদী, ছোট পাহাড় আর চায়ের ঘর-সব মিলিয়ে কোরাকুয়েন যেন নিখুঁত ভারসাম্যের প্রতীক। আমরা পাশাপাশি হাঁটছিলাম। নিকিতা হঠাৎ বললো-এ বাগানটা ৩০০ বছরের পুরোনো। তবু কী অদ্ভুতভাবে নতুন লাগে। আমি তাকিয়ে বললাম-যা যত্নে রাখা হয়, তার বয়স বাড়ে না। ওকায়ামা শুধু ইতিহাস নয়, লোককথার শহরও। জাপানের জনপ্রিয় কাহিনি মোমোতারো পিচ বয়ের জন্মভূমি এই অঞ্চল। শহরের নানা প্রান্তে পিচের প্রতীক, ভাস্কর্য আর স্মারকে ছড়িয়ে আছে সেই গল্প।
বিকেলে আমরা ট্রেনে পৌঁছাই কুরাশিকি বিকান ঐতিহাসিক এলাকাতে। এডো যুগে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল আজও তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। খালের ধারে সাদা দেওয়ালের গুদামঘর, ধীরগতির নৌকা, আর্ট গ্যালারি, ক্যাফে-সব মিলিয়ে জায়গাটাকে একটা রোমান্টিক আবহ তুলে ধরেছে। কুরাশিকিতেই অবস্থিত Ohara Museum of Art জাপানের প্রথম পশ্চিমা শিল্প জাদুঘর। মোনে, এল গ্রেকো, মাতিস-বিশ্বশিল্পের নামগুলো এখানে নিঃশব্দে কথা বলে। ইতিহাস এখানে শুধু পড়ার বিষয় নয়, অনুভবেরও। সন্ধ্যায় কিয়োটোর ট্রেনে ফেরার সময় জানালার বাইরে অন্ধকার নামে। নিকিতা চুপচাপ পাশে বসে। আমি বুঝতে পারি, এ ভ্রমণ শুধু শহর দেখার ছিল না, সময় আর অনুভূতির সঙ্গে হাঁটারও ছিল। নিকিতা হঠাৎ বললো-আজ যদি কেউ জিজ্ঞেস করে ওকায়ামা কেমন?
ইতিহাসের শহর, আমি বললাম। কিয়োটো থেকে ওকায়ামা-একদিনের পথ, কিন্তু স্মৃতিতে অনেক দীর্ঘ হয়ে থাকবে।
কিয়োটো থেকে Yunomine Onsen
সকালের কিয়োটো স্টেশন। হালকা মেঘলা আকাশ, স্টেশনের ব্যস্ততা আর চা বিক্রি বিক্রেতাদের ঘ্রাণ-সবকিছু মিশে এক আশ্চর্য ভোরের অনুভূতি তৈরি করছে। আমি আর নিকিতা ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি, হাতে হাতে ছোট ব্যাগ। আমরা যাচ্ছি, onomine onsen দেখতে। কিয়োটো থেকে আমরা প্রথমে JR Kinokuni Line ধরে, প্রায় ৩ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছাই Shing। সেখানে থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে Yunomine OnsenG পৌঁছাই। নিকিতা বলে, Yunomine OnsenG-এডো যুগের তীর্থযাত্রীরা Kumano Kodo pilgrimage route-এর বিশ্রাম কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত। ছোট, গোপনীয় বাথ হাউস, পাহাড়ের কোলে লুকানো শিন্তো শ্রাইন এবং ধীর নদী-সব মিলিয়ে প্রায় হাজার বছরের ইতিহাস এখানে নিঃশব্দে শোনা যায়। প্রাচীন বাথহাউসগুলোর মধ্যে একটি আমরা প্রবেশ করি। গরম পানির ভাপ মুখে লাগতেই নিকিতা হেসে বললো-তুমি জানো, মানুষ হাজার বছর ধরে এখানে এসে বিশ্রাম নিয়েছে। আমরা কি তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চাই? আমি বললাম-মোটেই না, আমরা শুধু তাদের ইতিহাসের সঙ্গী হতে চাই।
নিরিবিলি বাথের চারপাশে পাহাড়ের নীলচে ছায়া, গাছের নীরবতা-সব মিলিয়ে মনে হয়, আমরা ইতিহাসের ভেতরে হাঁটছি। গ্রামটি ছোট, তাই শিলালিপি, বাঁশঝোপ আর পাহাড়ের ধীরে চলা নদীর শব্দ যেন আরো কাছে লাগে। নিকিতা বললো-এখানে শুধু হাঁটা-চলা তরলেই হয় না। দাঁড়িয়ে ইতিহাসের গল্প শুনতে হয়, অনুভব করতে হয়।
আমি দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ি।
এখানকার হলুদ পাথরের উৎস (বাথ হাউসের প্রাকৃতিক ঝরনা) খুব ধীরে ধীরে বাষ্প ছাড়ছে। হাজার বছর ধরে মানুষ এই পানিতে স্নান করে, যাত্রার ক্লান্তি দূর করেছে-এমন ইতিহাস কেবল পড়ে বোঝা যায় না, অনুভব করতে হয়। সন্ধ্যার আগে আমরা ছোট নদীর ধারে বসি। পানি ধীরে ধীরে পাহাড়ের কোলে বয়ে যাচ্ছে, পাশে চেরি এবং Maple গাছের ছায়া পড়েছে। নিকিতা মাথা কাত করে বললো-আজ আমাদের পদচিহ্নও ইতিহাসের সঙ্গে মিশে যাবে। আমি বললাম-হয়তো হাজার বছর পরে কেউ আবার আমাদের মতো দেখবে। কিছুক্ষণ আমরা চুপচাপ বসে থাকি। নদীর ধীর ধারা, পাহাড়ের ছায়া আর ইতিহাসের নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি আমাদের চারপাশে ধ্বনিত হতে থাকে। রাতের ট্রেনে ফিরে আসার সময় কিয়োটোর লাইটের দিকে তাকিয়ে নিকিতা বললো-আজকের ইতিহাস, আজকের গল্প মনে রাখবে তো?
আমি বলি, মনে রাখবো-সেই সঙ্গে তোমাকেও।
ট্রেন ধীরে ধীরে কিয়োটোর স্টেশনে ঢুকছে আর আমরা জানি, Yunomine Onsen-এর নীরবতা, ইতিহাস ও আমাদের গল্প একদিন আবার মনে হবে, যেমন হাজার বছরের পথচারীরা মনে রেখেছে।
সেতো ইনল্যান্ড সি এবং তার দ্বীপগুলো
হিরোশিমা থেকে বেরোনোর সময় শহরটা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল না। ইতিহাসের শহরগুলো এমনই-তারা বিদায়ের সময় কিছু বলে না। হিরোশিমা স্টেশন থেকে JR সান্যো লাইনে ট্রেনে বসতেই শহরের দৃশ্য ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। ভবন কমল, পাহাড় এল, তারপর হঠাৎ করেই জল। নিকিতা বলে-সেতো ইনল্যান্ড সি নিজেকে এমনভাবেই হঠাৎ করেই দেখায়। এই পথ শুধু মানচিত্রের রেখা নয়; এটি শহর থেকে প্রকৃতির দিকে ধীরে সরে যাওয়ার এক প্রক্রিয়া। ট্রেনের জানালা দিয়ে যখন প্রথম সে তো ইনল্যান্ড সি চোখে পড়ে। ট্রেনের জানালা দিয়ে দ্বীপের সারি দেখে নিকিতা ফিসফিস করে বলে-দেখো, দ্বীপগুলো যেন ভাসছে। নিকিতা জানালার ধারে বসে। এ পথটা আমার চেনা, তবে আজ কিন্তু আলাদা লাগছে। সম্ভবত তুমি সঙ্গে আছো বলে-সে বলে।
আমি কিছু বলি না। কিছু জায়গার উত্তরে কথা থাকে না।
ট্রেন থেকে নেমে আমরা ফেরিতে উঠি। ফেরিতে বাতাস বদলে যায়। লবণের গন্ধ নাকে আসে। দূরে ইৎসুকুশিমার তোরি গেট-সমুদ্রের বুকে দাঁড়িয়ে। এতো শতাব্দী ধরে জল উঠেছে, নেমেছে, কিন্তু গেটটা দাঁড়িয়ে থেকেছে-যেন সমুদ্রই তার ভরসা।
আমি বলি-জলটা এখানে কেমন যেন আলাদা। নিকিতা বলে কারণ এখানে জলকে পবিত্র বলা হয়নি, পবিত্র হয়ে থাকতে দেওয়া হয়েছে। ফেরি থেকে ইৎসুকুশিমা শ্রাইনের দিকে তাকালে বোঝা যায় কেন এটি যুগের পর যুগ মানুষকে টেনে এনেছে। ১৪০০ বছরের ইতিহাস, তবু ক্লান্ত নয়। সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা তোরি গেট শিন্তো বিশ্বাসের সেই দর্শনকেই প্রকাশ করে, যেখানে প্রকৃতি আলাদা কিছু নয়, পবিত্রতারই অংশ। নিকিতা চুপচাপ শ্রাইনের ছবি তোলে। সঙ্গে তোরি গেট, কখনো আমারও। নিকিতা জানায়, এই সমুদ্র যুদ্ধ জানে না। জানে নৌকা, পণ্য আর মানুষের আসা-যাওয়া। একসময় এই জলপথেই শহরগুলো একে অন্যকে চিনেছে। আজ সেই পথ ধরে চলি আমরাও। হেইয়ান থেকে এদো যুগ-সে তো ইনল্যান্ড সি ছিল জাপানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের মেরুদণ্ড। নিকিতা ডেকে দাঁড়িয়ে চুল সামলায়। বলে তুমি আজ খুব চুপ কেন! আমি বলি, সমুদ্র দেখছি-সঙ্গে তোমাকেও। চোখের দৃষ্টির সঙ্গে মুখটা খোলা থাকলে কনসেনট্রেশন থাকবে না তাই।
নিকিতা হাসে।
আমরা ফেরি থেকে নামলাম ওনোমিচি দ্বীপে। এটি একটি পাহাড়ি শহর। সে তো ইনল্যান্ড সির আরেক মুখ ওনোমিচি-একটি বন্দর শহর, যেখানে পাহাড়ের গায়ে গায়ে মন্দির আর পুরোনো বাড়ি। টেম্পল ওয়াক নামে পরিচিত পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটলে একের পর এক বৌদ্ধ মন্দির যেগুলোর অনেকটাই মুরোমাচি ও এদো যুগের। চড়াই ভাঙতে ভাঙতে নিকিতা একটু থেমে দুষ্টুমি করে বলে-ভ্রমণ মানেই কি এমন হাঁটা?
আমি বলি, না তবে এমন হাঁটার পর দৃশ্যটা সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। উপরে উঠে সেতো ইনল্যান্ড সি-শান্ত জল, ছড়িয়ে থাকা দ্বীপ, নৌকার ধীর চলা চোখে পড়ে। নিকিতার কথাও কমে আসে। আমরা দুজনেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে সামনের দৃশ্য দেখতে থাকি। এরপর আমরা নাওশিমা দ্বীপে নামলাম। বোঝা যায়, এটি একটি আলাদা দ্বীপ। নিকিতা জানায়, নাওশিমা জাপানের আর দশটা দ্বীপের মতো নয়। এটি পরিচিত আধুনিক শিল্পের দ্বীপ হিসেবে। ১৯৯০-এর দশকে বেনেসে করপোরেশনের উদ্যোগে নাওশিমা হয়ে ওঠে এমন এক স্থান, যেখানে শিল্পকে গ্যালারিতে নয়, প্রকৃতির ভেতর বসানো হয়েছে। এখানে শিল্প দেওয়ালে ঝোলানো নয়; শিল্প বসে আছে সমুদ্রের ধারে, পাহাড়ের কোলে। ইয়ায়োই কুসামার হলুদ কুমড়ো শুধু ভাস্কর্য নয়, দ্বীপের প্রতীক।
দ্বীপে পা দিয়েই চোখে পড়ে ইয়ায়োই কুসামার বিখ্যাত হলুদ কুমড়ো ভাস্কর্য সমুদ্রের পাড়ে বসে থাকা এক নীরব প্রতীক। নিকিতা বলে ইয়ায়োই কুসামার হলুদ কুমড়ো শুধু ভাস্কর্য নয়, এটি দ্বীপের প্রতীক। আমি বলি-কুমড়োটা যেন দ্বীপটিকে পাহারা দিচ্ছে। শিল্প এখানে পাহারা নয়, ট্যুরিস্টদের আমন্ত্রণ জানায়-নিকিতা জানায়।
এরপর গেলাম চিচু আর্ট মিউজিয়াম দেখতে। এটি ভূগর্ভে নির্মিত, কিন্তু আলোয় ভরা। এখানে ক্লদ মোনে থেকে জেমস টারেল-শিল্পীরা প্রকৃত আলোকে ব্যবহার করেছেন শিল্পের অংশ হিসেবে। এই মিউজিয়ামের ধারণাই নাওশিমার দর্শন-মানুষ, শিল্প ও প্রকৃতি একে অন্যকে ছাপিয়ে নয়,পাশাপাশি থাকবে। নিকিতা বলে, চিচু আর্ট মিউজিয়াম আলোকে শিল্পে পরিণত করেছে। মিউজিয়ামে ঢুকে আলোটা টের পাই আগে, ছবিগুলো পড়ে। মাটির নিচে থেকেও এখানে আকাশ ঢুকে পড়ে। মনে হলো কেউ ইচ্ছা করে এখানে শব্দ কমিয়ে রেখেছে। শিল্প এখানে দেওয়ালে নেই, বাতাসে আছে। সমুদ্রের ধারে বসে থাকা হলুদ কুমড়োটা যেন কাউকে ডাকছে না-শুধু আছে।
এবার নামলাম ইনুজিমা দ্বীপে। ইনুজিমা ছোট, কিন্তু তার অতীত ইতিহাসে ভারী। নিকিতা জানায়, মেইজি যুগে এখানে গড়ে উঠেছিল কপার রিফাইনারি (তামা পরিশোধন কারখানা)-জাপানের আধুনিক শিল্পায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরে তা পরিত্যক্ত হয়, সময়ের সঙ্গে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। আজ সেই ধ্বংসস্তূপই রূপ নিয়েছে Inujima Seirensho Art Museum। স্থপতি সানাআ ও শিল্পী ইয়োকো ওনোসহ নানা শিল্পীর ভাবনায় এখানে শিল্প, স্থাপত্য ও পরিবেশ একসঙ্গে কাজ করে। পুরোনো ইটের দেওয়াল, খোলা আকাশ, প্রাকৃতিক আলো-সব মিলিয়ে মনে হয় শিল্প এখানে প্রদর্শিত নয়, আবিষ্কৃত। নিকিতা ফিসফিস করে বলে, এখানে শিল্প দেখছি না, অনুভব করছি। আমি বলি, সম্ভবত এটাই ইনুজিমার সার্থকতা।
এবার নামলাম তেশিমা দ্বীপে। তেশিমা সেতো ইনল্যান্ড সির সবচেয়ে নীরব দ্বীপগুলোর একটি। একসময় শিল্পবর্জ্য ফেলার কারণে দ্বীপটি আলোচনায় এসেছিল, একটি পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রতীক হিসেবে। দীর্ঘ আন্দোলন ও সংস্কারের পর আজ তেশিমা পরিচিত পরিবেশ সচেতনতা ও শিল্পের মিলনস্থল হিসেবে। এর হৃদয়ে রয়েছে Teshima Art Museum। কোনো চিত্র, কোনো ভাস্কর্য নেই-একটি সাদা, বক্রাকার স্থাপনা। ভেতরে মেঝে থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল বের হয়, আলো ঢোকে আকাশ থেকে। প্রকৃতিই এখানে শিল্প। নিকিতা ধীরে বসে পড়ে। এখানে কথা বলা বেমানান, সে বলে। আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিই। সে বলে, এই মিউজিয়াম শেখায়-শিল্প কখনো কখনো কেবল একটি জায়গা তৈরি করে, বাকিটা প্রকৃতি নিজেই পূরণ করে।
তেশিমার ছোট গ্রামগুলোতে হাঁটলে দেখা যায় পুরোনো ঘর, সবজিক্ষেত, সমুদ্রের দিকে মুখ করা বারান্দা। এখানে পর্যটন আছে, কিন্তু চিৎকার নেই। শিল্প আছে, কিন্তু দম্ভ নেই। নিকিতা বলে-এখানে থাকলে সময় নিয়ে তাড়া দিতে ইচ্ছে করে না। আমি বলি, কারণ সময় এখানে অতিথি, মালিক নয়।
সে তোর আরেক মুখ শোদোশিমা
নিকিতা জানায়, ১৯০৮ সালে এখানেই জাপানের প্রথম সফল অলিভ চাষ শুরু হয়। আজও দ্বীপটি ভূমধ্যসাগরীয় আবহ, জলপাই বাগান আর কানকেই গর্জের জন্য পরিচিত। এখানে ইতিহাস ভারী নয়, উষ্ণ। আমি বলি ঠিক তোমার মতোই। নিকিতা হাসে, জবাব দেয় না। দ্বীপের Olive Park-এ দাঁড়িয়ে দূরে তাকালে মনে হয়-জাপান নয়, যেন দক্ষিণ ইউরোপের কোনো দ্বীপ। নিকিতা বলে, এখানে আলোটা আলাদা। আমি বলি-কারণ ইতিহাস এখানে রোদ মেখে আছে। নিকিতা বলে, শোদোশিমা আরো অধিক পরিচিত কানকেই গর্জ-এর জন্য। এটি জাপানের তিনটি সুন্দর গিরিখাতের একটি। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে পথ, নিচে গভীর খাদ-প্রকৃতি এখানে নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশ করে শোদোশিমায় রোদ আলাদা। অলিভ গাছের ছায়া লম্বা, নরম। ইতিহাস এখানে ভারী নয়, উষ্ণ। নিকিতা বলে-এই দ্বীপটা ভালো মানুষদের মতো। আমি বলি, হ্যাঁ, ঠিক আমারই মতো। নিকিতা কটমটিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
হিরোশিমায় ফেরার সময় মনে হয়-
নাওশিমা শেখায় শিল্প কিভাবে নীরব হয়, শোদোশিমা শেখায় ইতিহাস কীভাবে আলো পায়, আর সে তো ইনল্যান্ড সি-সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। সন্ধ্যার ফেরিতে ফিরতে ফিরতে সূর্য সেতো ইনল্যান্ড সির জলে ডুবে যায়। ইনুজিমার ইটের দেওয়াল, তেশিমার জলবিন্দু-সব যেন একসঙ্গে মনে ভাসে। দিনের অভিজ্ঞতাগুলো শব্দে নয়, অনুভবে জমা হয়। হিরোশিমায় ফেরার ট্রেনে নিকিতা চুপচাপ বসে থাকে। আমি জিজ্ঞেস করি, কী ভাবছ? সে বলে-এই দ্বীপগুলো দেখার পর টোকিওর কোলাহল আর ভালো লাগবে না। শহরটাকে আলাদা লাগবে। তবে এই সমুদ্রটা আমার মনে থাকবে। আমি বলি, শুধুই সমুদ্র-আমাকে না? নিকিতা জবাব দেয় না।
আমি জানালার বাইরে তাকাই। দূরে হিরোশিমার আলো দেখা যাচ্ছে।
টোকিও থেকে Kochi
টোকিও শহর সবসময়ই ব্যস্ত। কংক্রিটের ভিড়, ট্রেনের সময়সূচি, মানুষের দ্রুত হাঁটা-সবকিছু যেন সময়কে ছুটিয়ে নিয়ে চলে। সেই শহর ছেড়ে Kochi-এর দিকে যাত্রা মানে শুধু একটি শহর বদল নয়, একেবারে অন্য ছন্দে প্রবেশ করা। শিকোকু দ্বীপে অবস্থিত Kochi জাপানের মূল পর্যটন মানচিত্রের বাইরে থেকেও আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এখানে ইতিহাস চাপা পড়ে নেই আধুনিকতার নিচে, আর প্রকৃতি নিজেকে সরিয়ে দেয়নি মানুষের জন্য। হানেদা বিমানবন্দর থেকে Kochi-এর ফ্লাইট প্রায় দেড় ঘণ্টার। বিমান আকাশে উঠতেই টোকিও ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসে। নিচে নদীর সরু রেখা, পাহাড়ের ঢাল আর ছোট শহরগুলো যেন মানচিত্রের মতো সাজানো। শিকোকু দ্বীপের দিকে নামার সময় দৃশ্য বদলে যায়-সবুজ পাহাড়, গভীর উপত্যকা আর প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জল একসঙ্গে চোখে পড়ে। Kochi যে পাহাড় আর সমুদ্রের মাঝখানে গড়ে ওঠা শহর, সেটা আকাশ থেকেই স্পষ্ট।
বিমানবন্দর থেকে শহরের দিকে যেতে যেতে বোঝা যায়-এখানে আকাশচুম্বী ভবন নেই, শিল্পাঞ্চলের চাপ নেই। রাস্তা প্রশস্ত, চারপাশে সবুজ, জীবন যেন ধীরে হাঁটে। Kochi শহরের একেবারে কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে Kochi Castle। ১৭ শতকের শুরুতে নির্মিত এই দুর্গটি জাপানের হাতে গোনা কয়েকটি দুর্গের একটি, যা আজও মূল কাঠামোসহ অক্ষত রয়েছে। দুর্গে ঢুকলে আধুনিক জাদুঘরের ঝকঝকে সাজ নয়, বরং কাঠের সিঁড়ি, সরু করিডোর, প্রহরীদের চলার পথ সবকিছু সেই সামুরাই যুগের বাস্তব অনুভূতি দেয়। এখান থেকেই একসময় Tosa Domain শাসিত হতো।
দুর্গের শীর্ষে উঠে তাকালে পুরো Kochi শহর চোখে পড়ে নিচে নদী, দূরে পাহাড়, আর শহরের নীরব বিস্তার। এই উচ্চতা থেকে বোঝা যায় কেন দুর্গটি সামরিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নিকিতা বলে- এখানে দাঁড়িয়ে ইতিহাস পড়তে হয় না, অনুভব করতে হয়। Kochi-এর ইতিহাস বলতে গেলে Sakamoto Ryoma-এর নাম অনিবার্য। তিনি ছিলেন Tokugawa শাসনের শেষদিকে এক বিপ্লবী চিন্তাবিদ, যিনি সামুরাই সমাজ ভেঙে আধুনিক জাপানের পথ তৈরি করেন। এই ইতিহাস বুঝতে আমরা যাই Sakamoto Ryoma Memorial Museum-এ। এখানে তার লেখা চিঠি, রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, বিদেশনীতি নিয়ে ভাবনা-সব কিছু সংরক্ষিত। জাদুঘরটি দেখলে বোঝা যায়, Ryoma শুধু একজন যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী চিন্তক। Kochi শহর তাকে শুধু স্মরণ করে না, গর্বের সঙ্গে বহন করে। শহর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত Katsurahama Beach Kochi-এর সবচেয়ে প্রতীকী স্থান। এটি সাধারণ বালুকাবেলা নয়, পাথুরে উপকূল, শক্ত ঢেউ আর গভীর সমুদ্র এখানে প্রকৃতিকে নাটকীয় করে তোলে। এখানেই পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে আছে Sakamoto Ryoma-এর বিশাল মূর্তি, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। এই ভঙ্গি প্রতীকী জাপান যে একসময় সমুদ্র পেরিয়ে বিশ্বের দিকে তাকাবে, সেই চিন্তার প্রকাশ।সমুদ্রের গর্জনের সামনে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, কেন Kochi-এর মানুষ সাহসী ও স্বাধীনচেতা। Kochi প্রিফেকচারের গর্ব Shimanto River-জাপানের অন্যতম পরিষ্কার নদী। এই নদীর বিশেষত্ব হলো, এখানে বড় কোনো বাঁধ নেই। নদী নিজের মতো করে বয়ে চলে। নদীর ওপর থাকা Chinkabashi সেতুগুলো রেলিংবিহীন। বন্যার সময় পানি যেন সহজে সেতুর ওপর দিয়ে চলে যেতে পারে-এই দর্শন প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের উদাহরণ। নদীর দুই পাশে ছোট গ্রাম, পাহাড়, ক্ষেত-এখানে জাপান শহুরে নয়, একেবারে গ্রামীণ ও মানবিক। সমুদ্রঘেঁষা শহর হওয়ায় Kochi-র খাবারে সামুদ্রিক স্বাদ প্রবল। সবচেয়ে পরিচিত খাবার Katsuo no Tataki-হালকা আগুনে ঝলসানো টুনা মাছ, রসুন ও লবণ দিয়ে পরিবেশন করা হয়। ছোট রেস্টুরেন্টগুলোতে বসে খেলে বোঝা যায়, Kochi-এর জীবনধারা কতটা সরল। খাবার এখানে প্রদর্শন নয়, ঐতিহ্য।
ফেরার দিন আবার আকাশপথ। নিচে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় পাহাড়, নদী আর সমুদ্র। Kochi পেছনে পড়ে থাকে, কিন্তু তার ছন্দ মনে থেকে যায়। টোকিওর আলো আবার সামনে আসে, ব্যস্ততা ফিরে আসে। কিন্তু ভেতরে রয়ে যায় Kochi-এর শান্তপ্রবাহ।
সামুরাই শহরে একদিন
হিরোশিমা শহরের সকালগুলো একটু সচেতন। ট্রাম চলে নিয়ম মেনে, মানুষজন হাঁটে স্থির পায়ে। আজ যাচ্ছি সামুরাই শহর হাগিতে, যেখানে ইতিহাস কথা বলে। হিরোশিমা স্টেশনে দাঁড়িয়ে নিকিতা হঠাৎ বলে উঠলো, আজ ইতিহাস দেখব ঠিকই। গম্ভীর কথা বললে আমি কিন্তু পালাবে। আমি হেসে বলি-চিন্তা নেই, আজ ইতিহাস আমাদের সঙ্গে চা খাবে। হিরোশিমা থেকে প্রথমে শিনকানসেন ধরি Shin-Yamaguchi পর্যন্ত। ট্রেন ছুটে চলে-শহর, টানেল, পাহাড় মুহূর্তে পেছনে পড়ে যায়। নিকিতা জানালার দিকে তাকিয়ে বলে-শিনকানসেনটা এমন দৌড়ায় যেন দেরি করে অফিস যাচ্ছে!
Shin-Yamaguchi থেকে এবার বাস। এখানেই যাত্রার আসল মজা। রাস্তা সরু হয়, চারপাশে পাহাড়, ধানক্ষেত, ছোট গ্রাম। বাসের জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ে সবুজ রোদ। প্রায় ৩ ঘণ্টার এই যাত্রা কখন যে শেষ হয়ে যায়, বোঝাই যায় না।
হাগিতে নেমে প্রথমেই যাই Hagi Castle Town-এ। এডো যুগে (১৭-১৯ শতক) এখানে সামুরাই পরিবাররা বাস করতো। সাদা দেওয়াল, সরু রাস্তা, পুরোনো বাড়ি-সবকিছু এতো অক্ষত যে মনে হয় সামুরাইরা একটু পরেই দরজা খুলে বেরিয়ে আসবে। এরপর যাই Hagi Castle Ruins। একসময় মোড়ি বংশের শক্ত দুর্গ ছিল এখানে। এখন শুধু পাথরের দেওয়াল আর খোলা আকাশ। সামনে সমুদ্র, পেছনে পাহাড়।
নিকিতা বলে-একসময় এখান থেকেই পুরো অঞ্চল শাসন হতো। এখন দেখছি হাওয়া আর পাখিরাই শাসন করছে-আমি জবাব দিই। নিকিতা আমার দিকে কটমট করে তাকায়। এরপর যাই Shokasonjuku Academy দেখতে। ছোট্ট একটা স্কুলঘর, কিন্তু এখান থেকেই জাপানের আধুনিক ইতিহাসের অনেক নেতা তৈরি হয়েছিল। Meiji Restoration-এর অনেক চিন্তার জন্ম এই জায়গায়। নিকিতা বলে-এই ছোট ঘর থেকেই জাপানের ভবিষ্যৎ বদলাতে শুরু করে। আমি জবাব দিই-বড় স্বপ্নের জন্য বড় বিল্ডিং লাগে না। নিকিতা বল্লো, কথাটা তার মনে ধরেছে।
হাগি বিখ্যাত Hagi Ware-এর জন্য। মাটির তৈরি চায়ের কাপ, প্লেট। একটা দোকানে ঢুকে নিকিতা একটা চায়ের কাপ হাতে তুলে নেয়। বলে এই কাপটা ধরলেই মনে করবো ইতিহাস আমার হাত ধরছে। আমি গম্ভীরভাবে বলি চা খাওয়ার আগে আমার হাতটাও ধরতে হবে।আমার ছোঁয়ায়ও তুমি ইতিহাসের স্পর্শ খুজে পাবে।
নিকিতা হো হো করে হেসে উঠলো।
একটা ক্যাফেতে বসে চা খাই। বাইরে শান্ত রাস্তা, ভেতরে নরম আলো। সন্ধ্যেবেলায় সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখি। আকাশে রঙগুলো পানিতে মিশছে, বাতাস ভিজে যাচ্ছে। ফেরার বাসে উঠতে উঠতে নিকিতা বলে-হাগি আমাকে ক্লান্ত করেনি বরং শান্ত করেছে। হিরোশিমায় ফিরে আবার শহরের আলো, ট্রাম, চেনা রাস্তা। কিন্তু হাগির ধীর ছন্দটা মনে লেগে থাকে।